

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বাণিজ্য চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু অংশ নিয়ে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে চীন। গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার সঙ্গে এক বৈঠকে চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়াকে অভিযোগ জানিয়েছে বেইজিং। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে কতটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে চীনের “গুরুতর উদ্বেগ” রয়েছে। “আমরা আশা করি মালয়েশিয়া তার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি যথাযথভাবে সমাধান করবে।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় (মিটি) চীনের উদ্বেগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে ও পরিষ্কার করেছে—যদিও সেসব বিষয় বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ব্লুমবার্গের সূত্র ধরে মালয়েশিয়ার দি এজ ও ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে সহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে চীন ও কম্বোডিয়ার মধ্যেও অনুরূপ একটি বৈঠক হয়, যেখানে চীনের বাণিজ্য দূত লি চেংগ্যাং ফনম পেনকে একই ধরনের উদ্বেগ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকেও কিছু বিষয় স্পষ্ট করা হলেও চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আর কোনো মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তদ্রুপ মালয়েশিয়ার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও কম্বোডিয়ার সরকার–উপদেষ্টার কার্যালয়ও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
গত মাসে ডনাল্ড ট্রাম্পের মালয়েশিয়া সফরের সময় স্বাক্ষরিত উভয় দেশের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার শর্ত রাখা হয়েছে। এতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ যাচাই এবং নিষেধাজ্ঞা–সংক্রান্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের চুক্তি অন্য দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে পারে—চীন বহুবার সতর্ক করলেও, এবারই প্রথম তারা কোনো দেশকে সরাসরি অভিযোগ জানিয়েছে।
ব্লুমবার্গ আরও জানিয়েছে, প্রকাশ্যে এই সমালোচনা দেখায় যে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মাঝামাঝি পথ চলতে গিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কতটা চাপের মধ্যে থাকে। চীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার হলেও, ট্রাম্পের শুল্ক–হুমকি দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্য ছাড় ও বিনিয়োগ চুক্তি করতে বাধ্য করছে।
ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর এশিয়া সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তির ঝড় তুলেছে, আলোচিত চুক্তিগুলো তার অংশ। মালয়েশিয়া চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পণ্য ও সেবায় বিশেষ সুবিধা দেবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ১৯% পাল্টা শুল্ক থেকে কিছু মালয়েশিয়ান পণ্যকে ছাড় দেবে। তবে একইসঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মালয়েশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাজনিত কারণে আরোপিত বাণিজ্য বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। সংবেদনশীল প্রযুক্তি–সম্পর্কিত মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করতে হবে, এবং অন্য দেশকে এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো যেন সাহায্য না করে—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া সমালোচনামূলক খনিজ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোসহ জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ যাচাইয়ের একটি প্রক্রিয়া চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের কথাও বলা হয়েছে উক্ত চুক্তিতে।
ব্লুমবার্গের বরাতে ইয়াহু ফাইন্যান্স আরও জানিয়েছে, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে, চুক্তিতে উল্লেখ আছে যে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য, কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ওপর সকল শুল্ক তুলে দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র শত শত পণ্যকে তার ১৯% শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেবে। মালয়েশিয়ার মতো কম্বোডিয়াকেও যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে হবে এবং “এনটিটি লিস্টে” থাকা নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর হতে হবে। তাছাড়া, তৃতীয় দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র তথ্য চাইলে তাতে সহযোগিতা করতে হবে।
এছাড়া দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা-বাণিজ্য জোরদার করবে এবং পণ্যের অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্ট ঠেকাতে পদক্ষেপ নেবে—চুক্তিতে এমনটিই উল্লেখ আছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
