

মাজহারুল ইসলাম বিপু, লালমনিরহাট: কয়েকদিন আগেও যেখানে ছিল ধু-ধু বালুচর, পানি শূন্যতার কারণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল তিস্তা নদী। সেই তিস্তা এখন উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে ভরা যৌবনে টইটুম্বুর। দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট খুলে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই উদ্বেগের মাঝেও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নতুন স্বপ্ন দেখছেন নদী পাড়ের মানুষ।
প্রতি বছর আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে উজানের ঢল এবং টানা বর্ষণের কারণে জেলার পাঁচটি উপজেলায় বন্যা ও নদী ভাঙনের প্রকোপ দেখা দেয়। তিস্তার ভাঙনে হাজার হাজার পরিবার হারিয়েছে তাদের বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার উৎস। একসময় যাদের গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছ ছিল, তাদের অনেকেই এখন অন্যের জমিতে কিংবা রাস্তার ধারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির চাপে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে নদী ভাঙনের ঝুঁকিও। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী তীরবর্তী হাজারো মানুষ।
এদিকে বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি আবারও আলোচনায় এসেছে বহু প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা। নদী খনন, পানি সংরক্ষণ, নদী ভাঙন রোধ এবং কৃষি উন্নয়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। মশাল প্রজ্জ্বলন, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আসন্ন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে তিস্তা অববাহিকার মানুষের মধ্যে। তাদের বিশ্বাস, এই সফরের মাধ্যমে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হতে পারে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণই নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমানেও আমূল পরিবর্তন আসবে।”
লালমনিরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক বলেন, “তিস্তা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
একদিকে উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যার আশঙ্কা তৈরি করেছে, অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্নে বুক বাঁধছেন নদী পাড়ের মানুষ। এখন তাদের সব আশা-ভরসা সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে।
