

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা ঠাকুরগাঁও। সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিদিন দিন-রাত নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা। চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো, সীমান্তে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। কিন্তু সীমান্ত রক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকার জরাজীর্ণ ও কাঁচা সড়ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার সড়ক এখনো পাকা হয়নি। বছরের অধিকাংশ সময় এসব সড়ক দিয়ে কোনো রকমে চলাচল সম্ভব হলেও বর্ষা মৌসুম এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা কাদায় ঢেকে যায়, সৃষ্টি হয় বড় বড় গর্ত। কোথাও কোথাও রাস্তার অস্তিত্ব পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সীমান্তে টহল কার্যক্রম পরিচালনা, জরুরি অভিযান এবং সন্দেহভাজন চলাচলের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) ক্যাম্পে যাতায়াতের প্রায় ৬ কিলোমিটার সড়ক বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রাস্তার বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালির কারণে চলাচল দুর্বিষহ হলেও বর্ষায় কাদা জমে পুরো সড়ক কার্যত চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিজিবির টহল যানবাহন, পিকআপ কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে সদস্যদের প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার হরিপুর উপজেলার বেতনা, বসতপুর ও ডাবরী, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কান্তিভিটা, পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনা এবং রাণীশংকৈল উপজেলার জগদল ও ধর্মগড় সীমান্ত এলাকা নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকার সীমান্ত ফাঁড়িগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রাখে বিজিবি। কিন্তু ফাঁড়িগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী অধিকাংশ সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে টহল কার্যক্রম অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়।
ধর্মগড় এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ আলী বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা কাদায় ভরে যায়। তখন হেঁটেই চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিজিবির গাড়ি চলাচলের কথা তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল নিয়েও চলা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর জন্য উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তারা বলেন, সীমান্তে যারা দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন, তাদের ক্যাম্পে যাওয়ার রাস্তার এমন দুরবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় থাকা এসব সড়ক দ্রুত পাকা করা প্রয়োজন।
এলাকার কৃষকরাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সীমান্ত অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কিন্তু খারাপ সড়কের কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কমে যায় ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ। উন্নত সড়ক ব্যবস্থা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তাই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিকেও গতিশীল করবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত অপরাধের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারলে অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। তাই সীমান্ত সড়কের উন্নয়নকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁও সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাস জানান, সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জেলার প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক উন্নয়নের একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে ধাপে ধাপে সড়কগুলো উন্নয়ন করা হবে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজীকরণ এবং সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আখলাকুর রহমান বলেন, “সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কাঁচা রাস্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বর্ষাকালে টহল কার্যক্রম পরিচালনায় নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সড়কগুলো পাকা করা হলে সীমান্তে নজরদারি, টহল এবং নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও কার্যকর ও গতিশীল হবে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। কারণ উন্নত সড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সীমান্তবাসীর জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
