

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক রসায়নের পথিকৃৎ, শিল্পোদ্যেক্তা, মানবতাবাদী ও ফাদার অব নাইট্রাইট খ্যাত জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়) এর স্মৃতি বিজড়িত খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়লী গ্রামের পৈত্রিক জন্মভিটা সংস্কার হচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পৈত্রিক ভিটাকে সংরক্ষণ ও সংস্কারের আওতায় নিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এতে স্যার পি.সি. রায়ের বসতবাড়ির ৫টি কক্ষ, ২টি বারান্দা, বাইরের পলেস্তরা (প্লাস্টার) চারপাশের রং ও নান্দনিক নকশা নতুনভাবে নির্মাণ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী ৪/ ৫ মাসের মধ্যে এই সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে মনে করছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় পি.সি. রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরিশ্চন্দ্র রায় ও মাতার নাম ভূবন মোহিনী দেবী। তাঁর পিতাও ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসচেতন মানুষ। রাড়ুলীর হরিশ্চন্দ্র রায়ের এই পৈত্রিক বাড়িতেই কেটেছে বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এখানেই গড়ে ওঠে তাঁর মনন, চিন্তা ও ভবিষ্যৎ জীবনপথের ভিত্তি। এসব কারণে এই বাড়িটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি ইতিহাস, স্মৃতি ও আদর্শের এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় রসায়নবিদ অধ্যাপক। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে উপমহাদেশে আধুনিক রসায়ন গবেষণার ভিত। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর “বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস” ছিল এশিয়ার প্রথম ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা আজও তাঁর শিল্পদর্শনের সাক্ষ্য বহন করে। বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবা, শিক্ষা বিস্তার ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান ইতিহাসে অনন্য।
কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রায় দেড় শ’ বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঐতিহাসিক বাড়িটি দীর্ঘদিন অবহেলা ও অযত্নে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। দেয়ালে ফাঁটল, খসে পড়া পলেস্তরা ও কাঠামো প্রত্ন শৈলীকে ঠেলে দেয় বিলুপ্তির মুখে। এনিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। লেখালেখিও হয় বিভিন্ন মিডিয়ায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংস্কার কাজের শুরুতেই বাড়িটি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো জৌলুস।
স্থানীয়রা মনে করছেন, এই সংস্কার কার্যক্রম শুধু একটি বাড়িকে রক্ষা নয়, এটি একটি ইতিহাস, আদর্শ ও একটি প্রজন্মকে সংরক্ষণের প্রয়াস। এর সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পৈতৃক ভিটা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে, যা দেশী-বিদেশী (দর্শনার্থী) পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই স্থাপনাকে সরকারিভাবে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে এখানে একটি গবেষণা কেন্দ্র, জাদুঘর ও শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলে নতুন প্রজন্ম আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জীবন, কর্ম ও মানবিক দর্শন সম্পর্কে আরোও বেশি জানতে পারবে অনুপ্রাণিত হবে তাঁর আদর্শে।
এ বিষয়ে রাড়ুলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল হাসেম জানান, বাংলার এই গর্বিত সন্তানের স্মৃতি ও অবদান ধরে রাখতে তাঁর পৈতৃক ভিটা সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ-যা অতীতকে বাঁচিয়ে রেখে ভবিষ্যতের পথে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
স্থানীয় প্রফুল্ল গবেষক ও সাবেক প্রধান শিক্ষক হরেকৃষ্ণ দাশ বলেন, এক সময় বাড়িটির দখল নিতে একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর হলেও তা ব্যার্থ হয়। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটিকে অদিগ্রহনের পর এটাই বড় ধরনের সংস্কার কাজ। যা ভবিষ্যতের পাথেয় হয়ে থাকবে।

