

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে দেশের আইনগত কাঠামোকে আরো আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কার্যকর করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে (ডিএনসি) আরো শক্তিশালী ও আধুনিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একগুচ্ছ নতুন ক্ষমতা, কাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন সংশোধনীতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে- ডিজিটাল স্পেসে মাদক ব্যবসা দমন, ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক লেনদেন প্রতিরোধ, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা, ডগ স্কোয়াড, মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, মানি লন্ডারিং তদন্ত, হাজতখানা, মালখানা, প্রসিকিউশন শাখা, বিশেষ মামলা ব্যবস্থাপনা সেল এবং সীমান্ত এলাকায় সমন্বিত অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইনটি সংশোধনের ফলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আরো গতিশীল হচ্ছে উল্লেখ করে মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে মাদক শনাক্তে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার, প্রতি থানায় বিশেষ সেল, সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা, উদ্ধার করা আলামত রাখার জন্য মালখানা স্থাপন এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মাদক মামলার বিচার সম্পন্ন করার সুযোগ থাকছে। ফলে এসব বিষয়গুলো মাদক নিয়ন্ত্রণে সার্বিকভাবে গতিশীল করবে।
ডিজিটাল স্পেসে কঠোর অবস্থান
সংশোধিত আইনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত মাদক কারবারকে সরাসরি আইনের আওতায় আনা।
আইনে সাইবার স্পেস এবং ‘ডিজিটাল ডিভাইসের বিস্তৃত সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। এতে শুধু কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন নয়, বরং ইন্টারনেট, ক্লাউড কম্পিউটিং, ব্লকচেইন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যতের সব ধরনের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডার্ক ওয়েব, ই-মেইল, এনক্রিপটেড মেসেজিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক ক্রয়, বিক্রয়, সরবরাহ, প্রচার, বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ কিংবা মধ্যস্থতা করেন, তাহলে সেটি মাদক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক লেনদেন বা তার চেষ্টা করাও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ ডিজিটাল প্রমাণ, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্যের ভিত্তিতেও মামলা করা যাবে।
সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান
ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মাদক ব্যবসার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, অপরাধের ধরণ ও গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র কিংবা পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অপরাধে ব্যবহৃত ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট, ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আদালত বা ট্রাইব্যুনালের আদেশে ব্লক, জব্দ, বাজেয়াপ্ত কিংবা রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যস্ত করা যাবে।
সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব
মাদক ব্যবসার ডিজিটাল রূপ মোকাবেলায় অধিদপ্তরে নতুন করে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ শাখা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এই ল্যাবের মাধ্যমে জব্দ করা মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, সার্ভার, ক্লাউড স্টোরেজ, ডিজিটাল ওয়ালেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা যাবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত হলে মহাপরিচালক বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) তা ব্লক বা অপসারণের অনুরোধ করতে পারবেন।
ডগ স্কোয়াডের আইনি ভিত্তি
প্রথমবারের মতো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব ডগ স্কোয়াড গঠনের বিধান যুক্ত হয়েছে। আইনেডগ স্কোয়াডের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষিত কুকুর এবং তাদের পরিচালনাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে।
এই ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা যাবে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, ডাক ও কুরিয়ার সেবাকেন্দ্র, গুদাম, যানবাহন, ভবন ও আইনানুগভাবে তল্লাশিযোগ্য অন্য যেকোনো স্থানে
মাদক শনাক্তকরণ, তল্লাশি, উদ্ধার এবং অভিযান পরিচালনায় এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডিএনসি এখন আরো শক্তিশালী বিশেষায়িত সংস্থা
সংশোধিত আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পোশাক ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের নিজস্ব মনোগ্রাম, পতাকা, পদক, সম্মাননা, পুরস্কার প্রবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসাধারণ বীরত্ব, সততা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার প্রদানের বিধান যুক্ত হয়েছে।
আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও নিজস্ব অস্ত্রাগার
দায়িত্ব পালনের সময় ডিএনসির অনুমোদিত কর্মকর্তারা সরকার নির্ধারিত পদ্ধতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন, ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। অধিদপ্তর নিজস্ব আরমারি বা অস্ত্রাগারও নির্মাণ করতে পারবে। গুলিবর্ষণের ঘটনায় সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নির্বাহী তদন্ত পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে।
হাজতখানা স্থাপনের সুযোগ
আইনে ডিএনসিকে নিজস্ব হাজতখানা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের থানায় হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত আইনানুগ সময় নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা যাবে।
পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক হাজতখানা থাকবে। শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাজতখানার স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কেও বিধান যুক্ত হয়েছে।
নিজস্ব মালখানা
অভিযানে জব্দ করা মাদক ও অন্যান্য আলামত সংরক্ষণের জন্য অধিদপ্তরের নিজস্ব মালখানা থাকবে। আদালতের আদেশ পাওয়ার ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে বাজেয়াপ্ত মাদক ধ্বংস করতে হবে। অন্য আলামত আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল
সংশোধিত আইনে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমে বিভিন্ন ধারায় ‘এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত’-এর পাশাপাশি ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ যুক্ত করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা যাবে।
প্রতিটি থানায় বিশেষ সেল
মাদক মামলা দ্রুত রুজুর জন্য প্রতিটি থানায় বিশেষ সেল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই সেল-দ্রুত মামলা রুজু করবে, অভিযোগপত্রের অগ্রগতি সংরক্ষণ করবে, নিষ্পত্তিকৃত মামলার তথ্য রাখবে, মাসিক প্রতিবেদন মহাপরিচালকের কাছে পাঠাবে।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সেল
মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ পাচার রোধে অধিদপ্তরে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সেল স্থাপনের বিধান যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় তদন্ত পরিচালনা করা যাবে।
সীমান্ত এলাকায় আরো জোরালো অভিযান
বাংলাদেশে মাদকের অবৈধ প্রবেশ ঠেকানোকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ডিএনসির কর্মকর্তারা সীমান্ত এলাকা, আন্তর্জাতিক সীমারেখা, স্থলবন্দর, নৌবন্দর, বিমানবন্দর এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, অভিযান, তল্লাশি, জব্দ, গ্রেপ্তার ও তদন্ত পরিচালনা করবেন। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হবে।
লাইসেন্স ছাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনায় শাস্তি
ডিএনসির লাইসেন্স ছাড়া মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, পুনর্বাসন কেন্দ্র বা কাউন্সেলিং সেন্টার পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। নিয়ম না মানলে মহাপরিচালক লাইসেন্স বাতিল করতে পারবেন। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যাবে।
নতুন মাদক শনাক্তে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম
নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স (এনপিএস) শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ডিএনসিকে অবহিত করতে হবে। এরপর অধিদপ্তর আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম চালু করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সতর্ক করবে। মামলা ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত বিচার মাদক মামলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নতুন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ও আদেশ লিখিত বা ডিজিটাল রেকর্ডে সংরক্ষণ করতে হবে। অধিদপ্তরে থাকবে মামলা ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ সেল। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রতি তিন মাস অন্তর মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে। সরকার চাইলে প্রশিক্ষিত কৌঁসুলিদের পৃথক প্যানেলও গঠন করতে পারবে।
সমন্বিত ও আধুনিক আইন প্রয়োগের পথে
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশোধিত আইনটি শুধু প্রচলিত মাদক ব্যবসা নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, আন্তঃদেশীয় এবং সংগঠিত মাদক চক্র মোকাবিলার জন্য একটি আধুনিক আইনি কাঠামো তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নতুন সংশোধনী আইনের বিধানগুলো যথাযথ প্রযোগের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
