ঢাকা
১৩ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৪:২৭
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৫, ২০২৬

ইইউতে তৈরি পোশাকের বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ আসে ইইউ থেকে। অথচ চলতি অর্থবছরে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–ডিসেম্বর) ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ কম।

এই নেতিবাচক প্রবণতা খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই সময়ে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে আয় ছিল ৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, ওভেন পণ্যের রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ওভেন পণ্য থেকে আয় হয়েছিল ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।

ইইউ বাজারে এ ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে রপ্তানিকারকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এ অঞ্চল থেকে। তাদের মতে, রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দেশের অর্থনীতিতে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) নীতির কারণে চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ইইউ বাজারে আরও বেশি অংশ দখলের জন্য ঝুঁকে পড়েছে। ফলে তারা ইইউতে রপ্তানি বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির চাপে চীন ও ভারত দ্রুত ইইউ বাজারে বেশি শেয়ার দখলের চেষ্টা করছে। ফলে আমরা ওই বাজারে অবস্থান হারাচ্ছি এবং আমাদের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।- বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির চাপে চীন ও ভারত দ্রুত ইইউ বাজারে বেশি শেয়ার দখলের চেষ্টা করছে। ফলে আমরা ওই বাজারে অবস্থান হারাচ্ছি এবং আমাদের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এবং মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় যখন আমরা চাপে আছি, তখন আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো বাড়তি প্রণোদনা দিয়ে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।’

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে আগের মতো নীতিগত সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংকটকাল কাটিয়ে উঠতে এসব সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রপ্তানি দুর্বলতা দেশের বাণিজ্য নীতি ও কৌশলগত প্রস্তুতির গভীরতর সমস্যাগুলোকেই তুলে ধরে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে বাণিজ্য স্থানান্তর (ট্রেড ডাইভারশন) ঘটেছে, বাংলাদেশ তা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা কিছু আফ্রিকান দেশ যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ধীরগতির নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমিত বাজার বৈচিত্র্য এবং প্রধানত তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে।’

নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিকে দায়ী করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মার্কিন বাজারে উচ্চ শুল্ক বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো কৌশলগতভাবে ইইউ বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি আশাব্যঞ্জক অবস্থায় নেই, যা ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যা শুধু একটি বাজারকেন্দ্রিক নয়, বরং এটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।’

ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা কিছু আফ্রিকান দেশ যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ধীরগতির নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমিত বাজার বৈচিত্র্য এবং প্রধানত তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে।- সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিকে অগ্রসর হতে হবে— যার মধ্যে রয়েছে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা।’

পাশাপাশি লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসার ব্যয় কমানো ও ইইউসহ অন্য বড় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় গতি আনাও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

সিপিডির এই ডিস্টিংগুইশড ফেলো সময়োপযোগী ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ না করা হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বাংলাদেশ আরও বেশি বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করেন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram