ঢাকা
১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ১০:৪১
logo
প্রকাশিত : জুলাই ১৪, ২০২৬

বিশাল পতাকা, শত শত স্বেচ্ছাসেবক- বিশ্বকাপের অজানা এক আয়োজন

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ শুরুর আগে মাঠজুড়ে উন্মোচিত হয় দুই দলের বিশাল জাতীয় পতাকা। দর্শকদের কাছে এটি কয়েক মিনিটের এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকে কয়েক দিনের কঠোর প্রস্তুতি, শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের পরিশ্রম এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।

ম্যাচ শুরুর প্রায় ছয় ঘণ্টা আগে থেকেই স্বেচ্ছাসেবকেরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন। নিবন্ধন, নির্দেশনা শোনা, খাবার খাওয়া, নিজেদের নির্ধারিত অবস্থান যাচাই এবং শেষবারের মতো মহড়া- সবকিছু শেষ করার পরই বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক সুর বেজে ওঠে, আর মাঠজুড়ে মেলে ধরা হয় বিশাল দুই জাতীয় পতাকা।

মেক্সিকোর মনতেরেই স্টেডিয়ামে দায়িত্ব পালন করা স্বেচ্ছাসেবক দিয়েগো মন্টেমায়োর বলেন, ‘আমরা দৌড়ানোর সময় দুই পাশেই তাকিয়ে থাকি, যাতে সবাই একই গতিতে এগোতে পারি।’

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পতাকার দৈর্ঘ্য ৫২.৭২ মিটার এবং প্রস্থ ৩৭.৮৪ মিটার। প্রায় ২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই পতাকাগুলো মাঠের প্রায় অর্ধেক অংশ ঢেকে ফেলে।

এত বড় পতাকা ধরে রাখতে প্রয়োজন হয় অন্তত ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবকের। তবে অনেক ম্যাচে এই সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ জন পর্যন্তও হয়েছে।

এই বিশাল পতাকাগুলো এক ভেন্যু থেকে অন্য ভেন্যুতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আলাদা একটি লজিস্টিকস দল কাজ করে। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে ২০০টিরও বেশি পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় তাদের। ফিফা অবশ্য জানায়নি, প্রতিটি দেশের জন্য কতগুলো করে পতাকা তৈরি করা হয়েছিল।

স্বেচ্ছাসেবক ব্রায়ান আগুইলেরা জানান, মনতেরেইতে ব্রাজিল ও মরক্কোর পতাকা ছিল, কারণ দুই দলই আগে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে খেলেছিল এবং পরবর্তী রাউন্ডে মেক্সিকোতে খেলার সম্ভাবনা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার পতাকাটি আবার প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরের মেক্সিকো সিটি থেকে আনা হয়েছিল।

পতাকাগুলো বড় কাঠের বাক্সে সংরক্ষণ করে স্টেডিয়ামে আনা হয়। বিশেষ একটি দল সেগুলো এমনভাবে ভাঁজ করে রাখে, যাতে দ্রুত মাঠে মেলে ধরা যায়।

প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবককে ফিফার অ্যাপে চেক-ইন করতে হয়। এরপর পরিচয়পত্রের বদলে একটি রিস্টব্যান্ড দেওয়া হয় এবং এক্সেল তালিকায় দেখে জানিয়ে দেওয়া হয়, পতাকার ঠিক কোন জায়গাটি তিনি ধরবেন। সেই অবস্থানগুলো কাপড়ের ওপরই চিহ্নিত করা থাকে।

এই পুরো কোরিওগ্রাফির জন্য তিন দিন মহড়া হয়- দুই দিন স্টেডিয়ামের বাইরে এবং শেষ দিন মাঠের ভেতরে। পুরো অনুশীলন পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ কোরিওগ্রাফি কোম্পানি কাজ করে এবং ফিফার কর্মকর্তারাও সরাসরি তদারকি করেন।

একজন স্বেচ্ছাসেবক বিভিন্ন ম্যাচে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে দায়িত্ব পালন করা এক নারী স্বেচ্ছাসেবক কখনও প্রতিপক্ষ দলের পতাকা ধরেছেন, কখনও মাঠের মাঝের ব্যানার বহন করেছেন, আবার কখনও ‘ফিফা’ লেখার অবস্থান নির্ধারণের কাজও করেছেন।

প্রতিটি ম্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ জন মানুষ কাজ করেন। খেলা শুরুর এক ঘণ্টা আগে সবাই স্টেডিয়ামের টানেলে জড়ো হন। শেষ নির্দেশনা শোনার পর শুরু হয় তাদের বহুদিনের অনুশীলনের বাস্তব পরীক্ষা।

ব্রায়ান আগুইলেরা বলেন, ‘এখনও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই মাঠে দাঁড়িয়ে বিশাল পতাকা মেলে ধরা- এটা এমন এক অনুভূতি, যা কোনো দিন ভুলব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পতাকা টানতে গিয়ে বুঝতে পারেন কতটা জোরে টানছেন, কারণ এটি বেশ ভারী। সেই অনুযায়ী গতি ঠিক করতে হয়। আমি এমন অনেককে দেখেছি, যারা আবেগে কেঁদে ফেলেছেন।’

১০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা ব্রাজিলিয়ান মারিয়া লুইজা কারভালহো ক্লাব বিশ্বকাপের পর এবার বিশ্বকাপেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফিলাডেলফিয়ায় ব্রাজিলের ৩-০ ব্যবধানে হাইতিকে হারানোর ম্যাচে তিনি মাঠের কেন্দ্রীয় ব্যানার ধরেন, প্রবেশপথের আর্চ বসাতে সাহায্য করেন এবং ব্রাজিলের পতাকাবাহী দলের সদস্য ছিলেন।

তার ভাষায়, ‘এই দায়িত্ব পেতে নির্দিষ্ট উচ্চতা থাকতে হয় এবং যত বেশি সম্ভব মহড়ায় অংশ নিতে হয়। আমি সবগুলো মহড়াতেই ছিলাম। জাতীয় সংগীতের সময় গান গাওয়া নিষেধ ছিল। নিজেকে সামলাতে গভীর শ্বাস নিচ্ছিলাম, যাতে কান্না না আসে। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে টানেলে ফিরেই শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছিলাম।’

অনুষ্ঠান শেষ হলে ছোট ব্যানারগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশাল পতাকাগুলো আবার রোল করে কাঠের বাক্সে ভরে পরবর্তী ভেন্যুর উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কিছু শহরে স্বেচ্ছাসেবকদের ম্যাচ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেমন ডালাসে তারা বিশেষ গ্যালারি থেকে খেলা উপভোগ করতে পেরেছেন। আবার কিছু ভেন্যুতে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যেই স্টেডিয়াম ছাড়তে হয়েছে।

এই স্বেচ্ছাসেবকেরা ‘প্রি-ম্যাচ সেরিমনি’ দলের সদস্য। নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আগের বছরের আগস্টে। এরপর ধাপে ধাপে চলে নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, শিফট পরিকল্পনা, স্বীকৃতি প্রদান, ইউনিফর্ম বিতরণ এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন।

বিশ্বকাপের এই নতুন উদ্বোধনী আয়োজনের ধারণা তৈরি করেছেন সাতটি দেশের পেশাদারদের একটি দল। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘৩৬০ ডিগ্রি সেরিমনি’, যার উদ্দেশ্য পুরো স্টেডিয়ামকে একটি অভিন্ন মঞ্চে পরিণত করা।

ফিফা সভাপতি বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুধু খেলোয়াড়দের নয়, প্রতিটি সমর্থকেরও উৎসব। নতুন এই ম্যাচ-পূর্ব আয়োজন সেই চেতনাকেই প্রতিফলিত করে।’

তবে পতাকাগুলো কোন উপাদানে তৈরি, কোথায় বানানো হয়েছে এবং বিশ্বকাপ শেষে সেগুলোর কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাব ফিফা প্রকাশ করেনি। ফলে মাঠজুড়ে দৃষ্টিনন্দন এই বিশাল পতাকার কিছু রহস্য এখনও অজানাই রয়ে গেছে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram