

ল্যাটিন আমেরিকা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া হান্টা নামে নতুন এক ধরনে ভাইরাস আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠেছে।হান্টাভাইরাস ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে থাকে। প্রধানত ইঁদুরের শুকনো মল থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণা শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। ইঁদুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সিডিসি)-এর মতে, সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালা থেকে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণ ঘটে।
আর্জেন্টিনায় গত এক বছরে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে ১০১টি নিশ্চিত হান্টাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা 'এমভি হন্ডিয়াস' নামের একটি জাহাজে ভ্রমণের পর এখন পর্যন্ত তিনজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এতে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। হান্টা ভাইরাস আক্রান্ত ওই জাহাজের চারজন যাত্রীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু এই জাহাজে ছিলেন বলে জানা গেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিপিন্স, রাশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরি ছিলেন এতে।
এদের মধ্যে অনেকে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিমানে করে ফিরে গেছেন। তাদের মাধ্যমে হান্টাভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভইরাসটির সংস্পর্শে আসতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর মোট আটজন আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ছয়জনের সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু (মৃত্যুহার ৩৮ শতাংশ) হয়েছে।
অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ববিদ মারিয়া ভ্যান কারকোভ আশ্বস্ত করে বলেন, এটি কোনো মহামারির সূচনাপর্ব নয়। এটি কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়, এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়। যদিও হামের মতো রোগগুলো খুব সহজে ও দ্রুত ছড়ায়, সে তুলনায় হান্টাভাইরাসের সংক্রমণের ক্ষমতা অনেক কম।মানুষ থেকে মানুষে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের ঝুঁকি খুবই কম বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।
আর্জেন্টিনা থেকে ছেড়ে আসা প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কীভাবে শুরু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টাভাইরাস দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম বা এইচপিএস। এতে সাধারণত শুরুতে ক্লান্তি, জ্বর ও পেশিতে ব্যথা দেখা যায়। পরে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি এবং পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় রোগটি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম বা এইচএফআরএস, যা আরও গুরুতর এবং প্রধানত কিডনিকে আক্রান্ত করে।পরবর্তী উপসর্গের মধ্যে থাকতে পারে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং কিডনি বিকলতা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০০১৮ সালে প্রথম হান্টাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয়।১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, ও চীনে এ ভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হান্টাভাইরাস সংক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসার পরামর্শ দেয় সিডিসি, যার মধ্যে থাকতে পারে অক্সিজেন থেরাপি, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এবং এমনকি ডায়ালাইসিস। গুরুতর উপসর্গ থাকা রোগীদের আইসিইউতে ভর্তি করতে হতে পারে।
মারাত্মক ক্ষেত্রে কারও কারও ইন্টিউবেশন বা কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস প্রয়োজন হতে পারে। ভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সিডিসি বাড়ি বা কর্মস্থলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেয়। সংস্থাটি আরও বলেছে, যেসব জায়গা দিয়ে ইঁদুর ঘরে ঢুকতে পারে, যেমন বেসমেন্ট বা চিলেকোঠার প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে হবে।
পাশাপাশি ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময় দূষিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢোকা এড়াতে মাস্ক বা সুরক্ষামূলক পোশাক ব্যবহারেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
