

জুয়েল রানা, তিতাস (কুমিল্লা) প্রতিনিধি: সংসারের অভাব ঘোচাতে, সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে প্রায় তিন বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার রবিউল হাসান রবিন (৩৮)। স্বপ্ন ছিল নিজের পরিবারকে একটু স্বচ্ছল জীবন উপহার দেওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন শুধুই স্মৃতি। দূর প্রবাসে নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়ে এখন কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রবিন।
গত সোমবার (৪ মে) সকালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বুকিত জলিল এলাকায় একটি চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন রবিন। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো কোনো সমস্যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কিন্তু পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে থাকা একটি ময়লার ড্রাম্পার থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। পরে মরদেহটি মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বিভাগের পুলিশ মর্গে নেওয়া হয়। রবিনের পরিবারের অভিযোগ, তাকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত রবিউল হাসান রবিন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের কালাইগোবিন্দপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে।
রবিনের বড় ভাই খোকন জানান, “আমার ছোট ভাই দীর্ঘ তিন বছর ধরে মালয়েশিয়ায় ছিল। সোমবার সকালে ফোনে জানতে পারি সে নিখোঁজ। পরে শুনি, কেউ তাকে হত্যা করে ময়লার ড্রাম্পারে ফেলে রেখেছে। খবরটা শুনে আমাদের পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।”
তিনি বলেন, “রবিনই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে মিহাদ হাসানের বয়স ১৫ বছর, মেয়ে রাইসা ৫ এবং ছোট ছেলে রোহানের বয়স মাত্র ২ বছর। এখন তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাই ভাবছি। আমরা চাই দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”
স্বামীর মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রবিনের স্ত্রী ফেরদৌসী আক্তার। তিনি জানান, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রবিন মালয়েশিয়ায় যান। প্রথমে শাহআলম এলাকায় কাজ করলেও মাত্র ১৫ দিন আগে বুকিত জলিলে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেন।
তিনি বলেন, “সোমবার সকালে জালাল ও সেন্টু নামের দুই ব্যক্তি ফোন করে জানায় রবিন কাজে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। পরে আমাদের এলাকার কয়েকজন প্রবাসী সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বললে নানা অসংগতি ধরা পড়ে। তখন থেকেই আমরা সন্দেহ করি, আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।”
ফেরদৌসী আক্তার আরও বলেন, “আমার দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে এখন আমি কোথায় যাবো? কিভাবে তাদের মানুষ করবো?” এই কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নিহতের শ্বশুর মো. রশিদ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “১৫ দিন আগে বুকিত জলিলে গিয়ে রবিন শ্রমিকদের বেতন হিসাবের দায়িত্ব পায়। এতে সহকর্মীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সেই প্রতিহিংসা থেকেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।”
তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, “আমরা রবিন হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই এবং দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে, প্রবাসে নিহত রবিনের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে তার পরিবার। বাড়ির আঙিনায় এখন শুধুই কান্না আর শোকের মাতম। যে মানুষটি পরিবারের সুখের জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই আজ ফিরছেন নিথর দেহ হয়ে।

