

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে আগের চেয়েও অনেক বেশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তুত তেহরান।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বোমাবর্ষণ কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘সিএনএন’-এর পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোটি কোটি ডলারের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ব্যর্থ করতে ইরান বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো অত্যন্ত সাধারণ নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংস করে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত সাফল্য অর্জনে বেশ দক্ষ এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে সুড়ঙ্গের নিচে চাপা দিয়ে রাখা ছিল তারই একটি বড় উদাহরণ। তবে, এই সামরিক অভিযানের পেছনে যদি কোনো বাস্তবসম্মত কৌশলগত লক্ষ্য বা স্থায়ী বিজয়ের পরিকল্পনা না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত তা একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতায় রূপ নিতে পারে।’
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসি’-র সিনিয়র গবেষক তৈমুর কাদিশেভ বিষয়টিকে প্রযুক্তির লড়াই হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানকে এই ধরনের ক্ষতি করতে আপনাকে অত্যন্ত জটিল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল (মার্কিন/ইসরায়েলি) অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে।
অথচ ইরান মাত্র কয়েকটা সাধারণ বুলডোজার ব্যবহার করে অত্যন্ত সস্তা প্রযুক্তিতে সেই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে।’
স্যাটেলাইট চিত্রে পুনর্গঠনের প্রমাণ
চলমান সংঘাতের সময় ইরান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে তাদের সুড়ঙ্গগুলো খনন করার কাজ চালিয়ে গেছে। অনেক সময় খননকাজে নিয়োজিত বুলডোজার লক্ষ্য করেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এই খননকাজ আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিএনএন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৮টি আন্ডারগ্রাউন্ড ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির যে ৬৯টি সুড়ঙ্গমুখ মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৫০টি সুড়ঙ্গমুখ সম্পূর্ণ চালু করেছে ইরান।
ইস্ফাহানের একটি ঘাঁটিতে ৪টি সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করতে অন্তত ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল মিত্রবাহিনী। মে মাসের শুরুর দিকের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে ডাম্প ট্রাক দিয়ে সেই গর্তগুলো ভরাট করা হয়েছে এবং ধ্বংস হওয়া রাস্তাগুলো পুনরায় পাকা করা হয়েছে।
খামেনি-এর একটি ঘাঁটিতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত ১০টি নির্মাণ যানকে সুড়ঙ্গ পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের যুদ্ধলক্ষ্য ও ইরানের বর্তমান সক্ষমতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। গত মার্চ মাসে এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প যুদ্ধের অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও লঞ্চারগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন।
গত মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব (ডিফেন্স সেক্রেটারি) পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের আর কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প অবশিষ্ট নেই এবং তারা সুড়ঙ্গ থেকে পুরনো ক্ষেপণাস্ত্র বের করলেও নতুন করে আর তৈরি করতে পারবে না।’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির শত শত মিটার গভীরে পাথরের নিচে অবস্থিত হওয়ায় ইরানের মূল ক্ষেপণাস্ত্র মজুত একেবারেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মাটির নিচে এখনো ইরানের প্রায় ১ হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অক্ষত রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার (আইসিএম) তথ্যানুযায়ী, ইরান ইতিমধ্যে তাদের ড্রোন উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার তৈরির সক্ষমতা ধারণার চেয়েও দ্রুত গতিতে পুনর্গঠন করে ফেলেছে।
