

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয় যদি হয় ‘হিন্দুত্ববাদী’ দলটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অপেক্ষার অবসান, তাহলে এর মধ্যে যেন ‘অস্বস্তির কাঁটা’ হয়ে রয়েছে ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর)।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দুই দিন গেলেও ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোতে এখনো বিজেপির ‘বাংলা জয়’ নিয়ে চলছে নানা রকম বিশ্লেষণ। নির্বাচনের আগেই এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি এই জয়ে কোনো ভূমিকা রেখেছে কিনা সেটিও আসছে আলোচনায়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ভারতের সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডটইন এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জিতেছে এমন অন্তত ১০৫টি আসনে এসআইআরের সময় বাদ পড়া ভোটারের মোট সংখ্যা দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি।
এর মধ্যে অন্তত ৮৬টি আসন আছে, যেখানে বিজেপি এর আগে কখনো জেতেনি।
৪ মে ঘোষিত ফল অনুযায়ী ২৯৩ বিধানসভা আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপি ২০৭, তৃণমূল কংগ্রেস ৮০, কংগ্রেস ২, সিপিএম ১ এবং স্বতন্ত্ররা ৩টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম আসন দরকার ছিল ১৪৭টি।
স্ক্রলডটইন বলছে, বিজেপির জেতা মোট ২০৭টির প্রায় অর্ধেকই (১০৫টি) হলো এমন আসন যেখানে এসআইআরের সময় বাদ পড়া ভোটারের মোট সংখ্যা দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি। এমনকি তাদের প্রার্থীর পাওয়া মোট ভোটের চেয়েও তা বেশি।
বিশ্লেষণভিত্তিক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এই এসআইআর প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত, যা ছয় মাস ধরে চলে এবং এর ফলে প্রায় ৯১ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে। এর মাধ্যমে রাজ্যের মোট ভোটারের ১২ শতাংশ কমে যায়।
বাদ পড়া বিপুল ভোটারের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখ ভোটারের বিষয়টি এখনও বিচারাধীন এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। বিজেপিই ছিল রাজ্যের একমাত্র রাজনৈতিক দল, যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছিল।
বুধবার প্রকাশিত স্ক্রলের এ বিশ্লেষণে বলা হয়, সোমবারের ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব’ ছিল। ফলে তৃণমূল কংগ্রেস, যারা গতবার ২১৫টি আসন জিতেছিল, এই নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা নেমেছে ৮০টিতে।
তবে দ্য স্ক্রল এর বিশ্লেষণ বলছে, তৃণমূলের পরাজয়ে এসআইআর একটি বড় ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
অন্তত ১০৫টি আসনে বিজেপি যত ভোটে জিতেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নাম নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। এসআইআরে নাম বাদ দেওয়ার তথ্যগুলো কলকাতার একটি পাবলিক পলিসি রিসার্চ সংস্থা ‘সাবার ইনস্টিটিউট’ এরইমধ্যে বিশ্লেষণ করেছে।
সেখানে দেখানো হয়েছে, বিজেপি জিতেছে এমন একটি কেন্দ্র হলো বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস। ২০২১ সালেও বিজেপি ইন্দাসে জিতেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূল বিজেপির চেয়ে ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। এরপর এসআইআর প্রক্রিয়ায় এই আসনের তালিকা থেকে মোট ৭ হাজার ৫১৫ জন ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়।
এবারের নির্বাচনে আসনটিতে বিজেপি মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে পুনরায় জয়লাভ করেছে।
বিশ্লেষণের সুবিধার্থে যেসব আসন তৃণমূলের কাছ থেকে বিজেপির হাতে এসেছে সেগুলোকে ‘সুইং সিট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্ক্রল বলছে, ১০৫টির মধ্যে ৮৬টি এমন ‘সুইং সিটে’ বিজেপির জয়ের ব্যবধান এসআইআরের সময় বাদ দেওয়া মোট ভোটারের চেয়ে কম ছিল।
তেমনই একটি আসন দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র। কয়েক দশক ধরে এই আসন বামপন্থিদের দখলে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এখান থেকে বিধায়ক ছিলেন।
এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও এই আসন তৃণমূল ও সিপিএমের মধ্যে হাতবদল হয়েছে।
২০২১ সালে তৃণমূল এই আসনে জিতেছিল এবং সিপিএম দ্বিতীয় হয়েছিল। ৫৩ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়ে বিজেপি প্রার্থী হয়েছিলেন তৃতীয়।
গত মাসে যাদবপুরে সরেজমিনে গিয়ে স্ক্রল দেখেছিল, এবারও সেখানে লড়াই মূলত সিপিএম ও তৃণমূলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা শোনা যাচ্ছিল।
যাদবপুরে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মোট ৫৬ হাজারের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সোমবার বিজেপি প্রথমবার এই আসনে জয়লাভ করে এবং তৃণমূল প্রার্থীর সঙ্গে তাদের প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ছিল বাদ পড়া ভোটারের অর্ধেকেরও কম, ২৭ হাজার ৭১৬ ভোট।
এবার যাদবপুরে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিপরীতে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক গতবারের চেয়ে প্রায় ২০ হাজার ভোট কম পেয়েছেন। সিপিএম পেয়েছে ৪১ হাজারের কিছু বেশি ভোট।
দ্য স্ক্রল আরো বলছে, সোমবার তৃণমূলের অনেক শক্তিশালী ‘দুর্গ’ ভেঙে পড়েছে। দলের বেশ কয়েকজন পরিচিত নেতা এমন সব আসনে হেরেছেন যেগুলোকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তৃণমূলের ‘ঘাঁটি’ বলে মনে করতেন।
বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ২০ বছর পর প্রথমবার টালিগঞ্জ আসনে পরাজিত হয়েছেন। বিজেপি প্রার্থী সেখানে ৬ হাজার ১৩ ভোটে জিতেছেন। অথচ এই আসনে এসআইআরের সময় মোট ৩৭ হাজার ৮৮৯ জন ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এছাড়া শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশিস চক্রবর্তীসহ অন্তত ১০ জন মন্ত্রীর অবস্থাও একই হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের নির্বাচনি এলাকায় ভোটার ছাঁটাইয়ের মোট সংখ্যা হারের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।
তৃণমূল নেত্রী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার ভবানীপুর আসনে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে হেরেছেন।
২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলে থাকা এই আসনে এসআইআরের সময় ৫১ হাজারেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।

