ঢাকা
logo
প্রকাশিত : January 24, 2026

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির ছায়ায় ভারত–ইইউর ‘মাদার অব অল ডিলস’

আগামী সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন।

রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং জাঁকজমক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুই নেতার এজেন্ডায় আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় থাকবে, এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। ইউরোপের জন্য বিশেষভাবে কঠিন ভূ-রাজনৈতিক মুহূর্তে এসেছে। কারণ রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে গ্রিনল্যান্ডের মার্কিন দখলের বিরোধিতা করার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে তার বাণিজ্য যুদ্ধ আরো তীব্র করার হুমকি দিয়েছেন এবং তারপরে পিছু হটছেন ।

অতিথি নির্বাচন ভারতের কাছ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। ওয়াশিংটন ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর পরেই দিল্লি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্বরান্বিত করছে। লন্ডন-ভিত্তিক চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের চিটিগজ বাজপেই বিবিসিকে বলেন, ‘এটি একটি সংকেত যে, ভারত একটি বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্র নীতি বজায় রাখছে… এবং তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ইচ্ছার প্রতি আনুগত্যশীল নয়।

’কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ জানুয়ারি উভয় পক্ষের নেতারা উচ্চ-স্তরের শীর্ষ সম্মেলনের জন্য মিলিত হওয়ার সময় চুক্তিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ভন ডের লেইন এবং ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল উভয়ই এটিকে ‘সকল চুক্তির জননী’ বলে অভিহিত করেছেন। উভয় পক্ষের প্রায় দুই দশকের কঠোর দর কষাকষির পর শেষ সীমার কাছাকাছি থাকা আলোচনার সমাপ্তির ওপর তাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই চুক্তিটি চার বছরের মধ্যে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হবে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সিনিয়র বিশ্লেষক সুমেধা দাসগুপ্ত বলেন, ‘ভূরাজনীতির কারণে উদ্ভূত হুমকি বাণিজ্যের জন্য এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করেছে। তাই উভয় পক্ষই এখন নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের শুল্ক–সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের চাপ যেমন খুব বেশি, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও চীনের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানোর তাগিদ সমানভাবে জোরালো, কারণ তারা চীনকে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না। দাশগুপ্ত বলেন, এই চুক্তিটি ভারতের দীর্ঘদিনের কড়া সুরক্ষাবাদী নীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হবে।

কূটনৈতিক সংকেত ছাড়াও, এতে দুই পক্ষের জন্য কী লাভ?

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি। দেশটি এই বছর জাপানকে ছাড়িয়ে জিডিপিতে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (২.৯৭ ট্রিলিয়ন পাউন্ড) অতিক্রম করার পথে রয়েছে। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভন ডের লেইন তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ভারতের সঙ্গে ইইউ ব্লকের যোগদান দুই বিলিয়ন মানুষের একটি মুক্ত বাজার তৈরি করবে, যা বিশ্বব্যাপী জিডিপির এক-চতুর্থাংশ।
দিল্লি-ভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) এর অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ভারত ইইউতে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং ৬১ বিলিয়ন ডলারের আমদানি করেছে, যার ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। কিন্তু ২০২৩ সালে ইইউ জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে অনেক ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা হ্রাস পেয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পোশাক, ওষুধ, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও যন্ত্রপাতির মতো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানির ওপর শুল্ক কমাবে এবং ভারতীয় সংস্থাগুলোকে উচ্চ মার্কিন শুল্কের ধাক্কা আরো ভালভাবে সামলাতে সাহায্য করবে।’ কিন্তু ভারত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোকে চুক্তি থেকে রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে, অন্যদিকে গাড়ি, ওয়াইন এবং স্পিরিটের মতো খাতগুলোতে পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে, যা পূর্ববর্তী চুক্তিতে গৃহীত পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন যুক্তরাজ্যের সঙ্গে। বাজপেই বলেন, ‘ভারতের প্রবণতা হলো বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য পর্যায়ক্রমে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে পরবর্তী আলোচনার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।’

অগ্রগতি হলেও কিছু বড় মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। ইউরোপের কাছে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরো শক্ত ডেটা সুরক্ষা আইন এবং কঠোর পেটেন্ট নিয়ম চায়। অন্যদিকে ভারতের জন্য বড় সমস্যা হলো ইউরোপের নতুন কার্বন কর, যার নাম সিবিএএম (কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম)। এই করটি ইউরোপ এ বছর থেকেই চালু করেছে।

জিটিআরআই-এর শ্রীবাস্তব বলেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় আমদানি শুল্ক তুলে নেওয়া হলেও সিবিএএম কার্যত ভারতীয় পণ্যের ওপর নতুন এক ধরনের সীমান্ত করের মতো কাজ করছে। এটি বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ক্ষতিকর, কারণ তাদের উচ্চ ব্যয় মেনে চলতে হয়, জটিল রিপোর্ট দিতে হয় এবং বেশি নির্গমন ধরা হলে শাস্তির ঝুঁকিও থাকে।

শ্রীবাস্তবের মতে, এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াবে নাকি কৌশলগতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত হবে—তা নির্ভর করবে এসব শেষ মুহূর্তের সমস্যার সমাধান কীভাবে হয় তার ওপর। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেক্স ক্যাপ্রি বলেন, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য অবিশ্বস্ত অংশীদারদের ওপর অতিরিক্ত বাণিজ্য নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে ট্রাম্পের আমেরিকা বা চীনের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বারবার শুল্ক বৃদ্ধি, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকিও কমে আসবে।

ক্যাপ্রি আরো বলেন, ভারতের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপে এই চুক্তির বিরোধিতা আছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা কমানোর ভারতের সিদ্ধান্ত ইইউ পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন পেতে সহায়ক হতে পারে, যা কার্যকর হওয়ার জন্য জরুরি। দাশগুপ্ত বলেন, ২০২৬ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ইইউ নেতারা এখন এই বাণিজ্য চুক্তিকে আগের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

সূত্র : বিবিসি

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram