

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরের যানজট নিরসনে আপাতত মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে না গিয়ে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মেট্রোরেল বা মনোরেল নির্মাণের পরিবর্তে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০০টি আধুনিক বাস নামানো, বাস রুট পুনর্বিন্যাস এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রণীত খসড়া ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনায় এ সুপারিশ উঠে এসেছে। ২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনার খসড়া সম্প্রতি মতামত, আপত্তি ও পরামর্শের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আগামী ৬০ দিন এ বিষয়ে মতামত নেওয়া হবে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের বর্তমান যাত্রীচাহিদা মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছেনি। একটি মেট্রোরেল ব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করতে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রীর চাহিদা প্রয়োজন। কিন্তু চট্টগ্রামে বর্তমানে সেই পরিমাণ যাত্রী নেই। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদও এ চাহিদা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ২০১৬ সালের বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত পরিবহন সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এ কারণে মেট্রোরেলের পরিবর্তে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনায় একটি সমন্বিত ‘বাস কোম্পানি’ গঠন, রুট র্যাশনালাইজেশন এবং বিআরটি চালুর মাধ্যমে নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে প্রায় ১ হাজার ১০০টি বাস চলাচল করলেও অধিকাংশই পুরোনো ও নিম্নমানের। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অপরিকল্পিতভাবে চলাচলের কারণে এসব বাস যানজট ও বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে বলে খসড়া মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন ৭০০ আধুনিক বাস চালু হলে ধাপে ধাপে লক্কড়ঝক্কড় বাস সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
উড়ালসড়ক-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিয়েও প্রশ্ন
খসড়া মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রামের অতীতের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার যথাযথ উন্নয়ন না করে ব্যয়বহুল উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ফলে নগরের সড়কব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে সিডিএ অ্যাভিনিউ ও বিমানবন্দর সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিদ্যমান উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে একই করিডরে মেট্রোরেল নির্মাণ কারিগরিভাবে জটিল হয়ে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের সুযোগ থাকলেও এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে, ফলে প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নাও হতে পারে।
আগে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরে বড় প্রকল্প
সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া মনে করেন, ৭০০ বাস নামানোর আগে নগরের বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো জরুরি।
তার মতে, বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও অটোরিকশার চাপ কমাতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন করেই গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
বাস্তবায়নে সমন্বিত কমিটি
মহাপরিকল্পনায় সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উন্নয়নকাজের সমন্বয় ও তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘সমন্বিত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সিটি করপোরেশনের মেয়র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারীর ভাষ্য, নতুন ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য নিরাপদ, সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলা। স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, আধুনিক গণপরিবহন এবং নৌ ও রেল যোগাযোগ উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সমীক্ষা এখনও চলমান। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসানের মতে, সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগে মেট্রোরেলের প্রয়োজন আছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে খসড়া মহাপরিকল্পনার মূল বার্তা—চট্টগ্রামের যানজট মোকাবিলায় এখনই হাজার হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল নয়; বরং তুলনামূলক কম ব্যয়ে আধুনিক বাস, সুশৃঙ্খল রুট, নির্দিষ্ট বাস লেন এবং উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান।
