

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন কাজ না হওয়া। জলাধার নির্মাণ না করা, ড্রেন ও ডোবা ভরাট করে আবাসন প্লট তৈরি, রাস্তা উঁচু না করা, খাল দখল এবং ক্রস-কালভার্টের পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ ছয়টি কারণ চিহ্নিত করেছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
নগরের জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনটি শিগগিরই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও ৩৪ ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী।
গত ৭ থেকে ১১ জুলাই টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে নগরের কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, সিএন্ডবি মোহরা ও কুয়াইশ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এসব এলাকার পানি সরাতে সেনাবাহিনীর ৩৪ ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে ১৬টি কুইক রিঅ্যাকশন (কিউআর) টিম কাজ করে। পাশাপাশি চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরাও কাজ করেন।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আগাম পরিকল্পনা থাকায় কাতালগঞ্জ ও কাপাসগোলা এলাকায় পানি উঠলেও দ্রুত তা সরিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। তবে আগ্রাবাদে প্রায় ২৪ ঘণ্টা এবং মোহরা ও কুয়াইশ এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পর্যন্ত পানি জমে ছিল।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আগেই জানা ছিল কাতালগঞ্জ ও কাপাসগোলা এলাকায় পানি উঠবে। বৃষ্টি থামার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে—এমন পরিকল্পনা অনুযায়ী কুইক রিঅ্যাকশন টিম পাম্পিং ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছে।’
রাস্তা উঁচু না করায় আগ্রাবাদে জলাবদ্ধতা
সেনাবাহিনীর তদন্তে বলা হয়েছে, আগ্রাবাদ কমার্শিয়াল ও ব্যাংকিং এলাকায় মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী রাস্তা উঁচু না করায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
২০২২ সালে চসিকের সঙ্গে যৌথভাবে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীতে পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে রাস্তা উঁচু করার পাশাপাশি সমান উচ্চতায় ড্রেন নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু ড্রেন নির্মাণ করা হলেও রাস্তা উঁচু করা হয়নি। ফলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
সিএন্ডবিতে পানি চলাচলের পথ দখল
সিএন্ডবি ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক বলেন, এলাকার পানি পাশের বিলে যেতে পারছে না। এ ছাড়া তিনটি ক্রস-কালভার্টের দুই পাশে পানি চলাচলের চ্যানেল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ড্রেন ও নালা দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান ও গুদাম নির্মাণ করায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
কুয়াইশে খালের নাব্যতা কমেছে
কুয়াইশ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে খালের নাব্যতা কমে যাওয়া ও ছোট খাল দখলের কথা বলা হয়েছে। আগে কুয়াইশ খাল দিয়ে শিল্পকারখানা ও আশপাশের এলাকার পানি হালদা নদীতে গিয়ে পড়ত। হালদা নদী রক্ষায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ওই প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কুয়াইশ, কৃষ্ণা ও লিংক খাল দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খালগুলোর প্রস্থ ও নাব্যতা কমে গেছে। এতে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। ছোট খালগুলো দখল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত পাম্পের মাধ্যমে পানি সরানো গেলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে জলাধার নির্মাণের বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাধার সংরক্ষণ ও নির্মাণ, ড্রেনেজব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। সেনাবাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন ও কারিগরি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
