

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আর অবকাঠামো উন্নয়নের কথা থাকলেও ছিটেফোটা লাগেনি রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে। উল্টো কোটি টাকার দেনার বোঝা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ। ফলে থমকে আছে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রম। দ্রুত দেনার টাকা পরিশোধ চায় জেলা পরিষদ। পৌর কর্তৃপক্ষ বলছেন, দেনার টাকা পরিশোধ করা হবে।
জানা গেছে, ৩৩ বছর আগে (১৯৯২-১৯৯৩ অর্থবছরে) রাজবাড়ী শহরের শ্রীপুর এলাকায় ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির ওপর ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয়ের অর্থ ধাপে ধাপে জেলা পরিষদের নিকট পরিষদের কথা ছিল রাজবাড়ী পৌরসভার। ২৬ বছর পর চুক্তির ১ কোটি ৬১ লাখ অর্থই পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
দেনার অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি টার্মিনালের ভাঙ্গাচোরা অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং নানা অব্যবস্থাপনায় বর্তমান টার্মিনালটি। এ নিয়ে ক্ষোভ পরিবহনের মালিক ও চালকদের। সদর উপজেলার শ্রীপুরে ৩৩ বছর আগে প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল আজও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অবহেলা ও অযত্নে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনাল ভবন।
মূল্যবান অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এটি এখন বাসের গ্যারেজ ও যানবাহন মেরামতের আর মাদকসেবীদের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা।
স্থানীয় বাসমালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহর থেকে দূরে অবস্থান এবং টার্মিনাল এলাকায় পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় বাসমালিকরা এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। কয়েক দফা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসই হয়নি।
শ্রমিকেরা বলছেন, টার্মিনালটি কেউ দেখভাল করেন না। বন্ধ টার্মিনালে নতুন করে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন জেলা পরিষদ। শ্রমিকেরা বলছেন উদ্যোগটি ভালো। দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে টার্মিনালের আয় বৃদ্ধি পাবে। টার্মিনাল এলাকায় অডিটোরিয়াম নির্মাণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মাঝে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আসছে এক কোটি টাকা।
রাজবাড়ী রেড ক্রিসেন্টের সদস্য ও বিএনপি নেতা কাজী জিসান আহমেদ বলেন, রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি অপরিকল্পিতভাবে শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে নির্মাণ করায় দীর্ঘ ৩৩ বছরেও তা চালু করা সম্ভব হয় নাই। ফলে এই টার্মিনালের উন্নয়ন অধরাই থেকে গেল। আর কোটি টাকার দেনায় হিমশিম রাজবাড়ী পৌর কর্তৃপক্ষ।
এতে রাজবাড়ীর ব্যস্ততম প্রধান সড়কের ওপর বড়পুলে ও মুরগির ফার্মে ঝুঁকিপূর্ভাণবে যাত্রী-সাধারণের নামানো ও উঠানোর ফলে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে যাত্রী-চালকদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে যুগ যুগ ধরে।
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, টার্মিনালের এক পাশে ১ হাজার বিশিষ্ট একটি অডিটরিয়াম ও অন্য পাশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। নামমাত্র ইজারা দিয়ে দখলে রেখে গ্যারেজ পরিচালনা করছেন রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ। এটা হতে দেয়া যাবে না।
চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণ ব্যয়ের অর্থ ধাপে ধাপে জেলা পরিষদকে পরিশোধ করার কথা থাকলেও পৌরসভা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অন্যদিকে পৌরসভা টার্মিনাল ইজারা এবং সংলগ্ন মার্কেট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে।
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ এর সাধারণ সম্পাদক সুকুমার ভৌমিক জানান, তাদের দাবি টার্মিনাল চালু রাখা। তিনি আরো জানান, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আর্মির ভয়ে কিছুদিন চালু থাকলেও তা ১/২মাস পরেই আবার বন্ধ হয়ে যায়।
রাজবাড়ী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পৌরসভার বন্দোবস্ত নিয়ে শহরের মুরগির ফার্ম এলাকায় বাস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি বাস থেকে ৫০ টাকা করে পার্কিং ফি নেওয়া হয়। বাস টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য সংগঠনটি পৌরসভার কাছ থেকে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ টাকায় বন্দোবস্ত নিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের মূল ভবনের সামনে বিশাল এক জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আর ভবনের আশপাশের এলাকা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। যাত্রীদের জন্য নির্মিত অপেক্ষমাণ কক্ষের অধিকাংশ চেয়ার নাই। ভবনের দরজা-জানালা ভাঙা, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন কক্ষে যানবাহন মেরামতের যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানি। টার্মিনাল ঘিরে গড়ে ওঠা বেশিরভাগ দোকানপাটও বন্ধ হয়ে গেছে।
আর রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক কল্যাণ চৌধুরি জানান, বাস টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দেনার অর্থ ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হচ্ছে। অডিটোরিয়াম নির্মাণের ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে।
তবে কোটি টাকার দেনার সংকট কাটিয়ে টার্মিনালকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করে গড়ে তুলতে দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
