

মো: নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে না তুললে কেবল চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁর ভাষায়, একজন মানুষ যখন শুধু নিজের নয়, অন্যের কষ্টও অনুভব করতে শেখে, তখনই সে প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়।
মঙ্গলবার বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে ‘হেপাটাইটিস: আসুন, বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই’ প্রতিপাদ্যে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। লিভার কেয়ার সোসাইটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি পরিবার। একজন শিশুর জন্মের আগ থেকেই পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। পরিবার ও সমাজের অবহেলার কারণেই অনেক তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, যা সামাজিক অবক্ষয় ও বিভিন্ন রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, “মানুষ যখন নিজের ব্যথা বোঝে, তখন সে জীবিত। আর যখন অন্যের ব্যথা বোঝে, তখন সে প্রকৃত মানুষ।” ব্যক্তি ও সমাজে মানবিক দায়িত্ববোধ বাড়লে অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং নানা সামাজিক সংকট কমিয়ে আনা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, পৃথিবীতে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ রয়েছে, কিন্তু মানুষের লোভ মেটানোর মতো সম্পদ নেই। তাই দায়িত্বশীলতা, সংযম ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি।
উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বড় বড় ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে সেই শিক্ষার ইতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে অপরাধ, মাদকাসক্তি ও রোগব্যাধি কমাতে না পারলে সেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না।
স্বাস্থ্যসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিদিন লিভার, কিডনিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষ সহায়তার জন্য তাঁর কাছে আসেন। এসব রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিরাপদ পরিবেশ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদাহরণ তুলে তিনি জানান, গত শনিবার চট্টগ্রাম জেলায় ৬ হাজার ২০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ থেকে ১৩৫ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এসব বর্জ্য জমে ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা প্রায়ই অন্যের ভুল নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালন করছি কি না, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করি না। বাইরে আলোকিত করলেই হবে না, ভেতরটাও আলোকিত হতে হবে।”
লিভার কেয়ার সোসাইটির কার্যক্রমের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, হেপাটাইটিস ও লিভারের বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনি বলেন, দেশে আনুমানিক এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিবছর ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এ রোগে। আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই নিজেদের রোগ সম্পর্কে জানেন না। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দায়ী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সহযোগী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি) ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন। সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লিভার কেয়ার সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. তারেক শামস। আলোচনা শেষে চিকিৎসকেরা উপস্থিত রোগীদের হেপাটাইটিস বি ও সি শনাক্তে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেন।
