

পিন্টু দেবনাথ: প্রকৃতি যেখানে অকৃপণ হাতে তার রূপ ঢেলে দিয়েছে, সেই জনপদ মৌলভীবাজার। চা-বাগান, পাহাড়, আর হাকালুকি হাওরের দেশ হিসেবে পরিচিত এই জেলাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার দাবি রাখে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছি না। বিশেষ করে পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়ন, একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুকরণ—এই তিনটি দাবি এখন সময়ের দাবি।
মৌলভীবাজারের অর্থনীতি মূলত চা ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে। পর্যটন এখানে তৃতীয় স্তম্ভ হতে পারে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এবং হাকালুকি হাওরকে কেন্দ্র করে যদি একটি 'ট্যুরিজম সার্কিট' গড়ে তোলা যায়, তবে এটি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ খুলে দেবে। বর্তমানে পর্যটকরা মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগে এখানে আসেন। সরকারি উদ্যোগে যদি পরিকল্পিত রিট্রিট সেন্টার, নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবে মৌলভীবাজার হবে এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট।
প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের বসতি এই মৌলভীবাজারে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ না থাকা চরম বৈষম্যের পরিচয় দেয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সিলেট বা ঢাকায় নেওয়ার পথেই অনেক সময় প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে চা-শ্রমিক এবং হাওর অঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠী উন্নত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপিত হলে কেবল চিকিৎসা সেবাই নিশ্চিত হবে না, বরং এ অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজ জেলাতেই উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ পাবে। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক দাবি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত শমশেরনগর বিমানবন্দরটি বর্তমানে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। সিলেট বিভাগের এই জনপদ থেকে প্রচুর মানুষ প্রবাসে অবস্থান করেন। শমশেরনগর বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হলে প্রবাসীদের যাতায়াতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একইসঙ্গে ঢাকা থেকে পর্যটকদের আসার পথ সুগম হবে। আকাশপথের যোগাযোগ ছাড়া আধুনিক পর্যটন বা বিনিয়োগ কোনোটাই টেকসই হয় না। বিমানবন্দরটি সচল হলে মৌলভীবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রফতানিযোগ্য চা শিল্পের বিকাশে অভাবনীয় গতি আসবে।
মৌলভীবাজারের এই উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো একে অপরের পরিপূরক। বিমানবন্দর চালু হলে পর্যটক বাড়বে, আর পর্যটক বাড়লে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র হবে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেবে। মৌলভীবাজার কেবল একটি জেলা নয়, এটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের এক অনন্য কেন্দ্র। এর উন্নয়ন মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা।

