ঢাকা
২৯শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৩:৩৮
logo
প্রকাশিত : মার্চ ১৬, ২০২৬

কাবার কালো গিলাফ, ইতিহাস ঐতিহ্য ও মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার

পৃথিবীর অগণিত মুসলমানের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবা শরিফ। যুগে যুগে অসংখ্য মানুষ এই পবিত্র গৃহের দিকে মুখ করে প্রার্থনায় দাঁড়িয়েছে, অশ্রু ঝরিয়েছে এবং আত্মার গভীরতম আকাঙ্ক্ষা নিবেদন করেছে।

মক্কার পবিত্র মসজিদ কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি তাওহিদের শাশ্বত প্রতীক, মানবজাতির আধ্যাত্মিক ঐক্যের কেন্দ্র এবং ইসলামী ইতিহাসের এক অবিনাশী স্মারক।

এই পবিত্র ঘরকে আচ্ছাদিত করে রাখা কালো গিলাফ যা আরবি ভাষায় ‘কিসওয়া’ নামে পরিচিত মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘ ইতিহাস, শিল্পকলার ঐতিহ্য এবং গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অনন্য প্রতিফলন।

কাবা শরিফকে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করার ইতিহাস ইসলামের আগমনেরও বহু আগে থেকে প্রচলিত ছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ইয়েমেনের প্রাচীন শাসক সর্বপ্রথম কাবা ঘরকে কাপড়ে ঢাকার প্রথা চালু করেন। এটি ঘটেছিল আনুমানিক খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর দিকে।

সে সময় তিনি ইয়েমেন থেকে বিশেষ বস্ত্র এনে কাবা শরিফকে আচ্ছাদিত করেন। পরবর্তীকালে এই প্রথা আরব সমাজে গভীর সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।

ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবের বিভিন্ন গোত্র কাবা শরিফকে কখনো সুতি কাপড়, কখনো ইয়েমেনি বস্ত্র কিংবা বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করত।

ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় জানা যায়, তখন কাবার গিলাফ সবসময় কালো ছিল না, বরং কখনো সাদা, কখনো লাল, আবার কখনো সবুজ বস্ত্র দিয়েও তা আচ্ছাদিত করা হয়েছে।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর এই ঐতিহ্য নতুন মর্যাদা লাভ করে। মহানবী মক্কা বিজয়ের পর কাবা শরিফের পবিত্রতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং গিলাফ দেওয়ার প্রথাকে অব্যাহত রাখেন। তাঁর সময়েও কাবা শরিফকে উৎকৃষ্ট বস্ত্র দিয়ে আচ্ছাদিত করা হতো, যা এই পবিত্র গৃহের প্রতি মুসলমানদের গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে ইসলামের প্রথম যুগের শাসকরাও এই প্রথাকে গুরুত্বের সঙ্গে অব্যাহত রাখেন। দ্বিতীয় খলিফা কাবা শরিফের গিলাফ তৈরিতে উন্নত মানের বস্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা করেন। তার সময় মিসরের উৎকৃষ্ট কাপড় দিয়ে গিলাফ প্রস্তুত করা হতো। তৃতীয় খলিফা এর আমলেও এই ঐতিহ্য আরও সুসংগঠিত হয় এবং নিয়মিতভাবে গিলাফ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়।

ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির দায়িত্ব মুসলিম শাসকদের কাছে এক বিশেষ সম্মানের বিষয় হয়ে ওঠে। উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনামলে গিলাফ তৈরির শিল্প আরও সমৃদ্ধ হয়।

আব্বাসীয় যুগে প্রথমবারের মতো গিলাফে পবিত্র কুরআনের আয়াত সুদৃশ্য লিপিতে অঙ্কিত করা শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে ইসলামী শিল্পকলার এক অনন্য নিদর্শনে পরিণত হয়।

মধ্যযুগে দীর্ঘ সময় ধরে মিসরের শাসকেরা কাবা শরিফের গিলাফ তৈরির দায়িত্ব পালন করতেন। কায়রো শহরে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা গিলাফ প্রতি বছর হজের আগে শোভাযাত্রার মাধ্যমে মক্কায় পাঠানো হতো। এই শোভাযাত্রা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল এবং অসংখ্য মানুষ এই দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাবা শরিফের গিলাফের রংও পরিবর্তিত হয়েছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাদা, লাল ও সবুজ রঙের গিলাফ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আব্বাসীয় যুগের শেষভাগ থেকে ধীরে ধীরে কালো রঙ স্থায়ী রূপ লাভ করে। কালো বস্ত্রের ওপর সোনালি সূচিকর্মে কুরআনের আয়াত অঙ্কিত করার ঐতিহ্য পরবর্তীকালে কাবা শরিফের গিলাফের স্বীকৃত রূপ হয়ে ওঠে।

বর্তমান যুগে কাবা শরিফের গিলাফ সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে মক্কায় অবস্থিত বিশেষ কারখানায় প্রস্তুত করা হয়। প্রতি বছর নতুন গিলাফ তৈরিতে বিপুল পরিমাণ খাঁটি রেশম ব্যবহার করা হয় এবং তাতে সোনালি ও রূপালি সূতায় কুরআনের আয়াত, কালিমা এবং বিভিন্ন দোয়া অত্যন্ত নিখুঁত কারুকাজে অঙ্কিত করা হয়।

হজের সময় পুরোনো গিলাফ সরিয়ে নতুন গিলাফ পরানো হয়। সেই মুহূর্তটি মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য দৃশ্য হয়ে ওঠে। লক্ষ লক্ষ মুসলমান এই পবিত্র দৃশ্যের সাক্ষী হতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন।

কাবা শরিফের কালো গিলাফ তাই কেবল একটি কাপড় নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও ঈমানের প্রতীক। যুগের পর যুগ ধরে এই গিলাফ যেন নীরবে ঘোষণা করে চলেছে মানবজাতির এক মহান সত্য আল্লাহর একত্বের প্রতি মানুষের অবিচল বিশ্বাস।

আজও যখন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলমানরা পবিত্র মসজিদ এ এসে কাবা শরিফের দিকে তাকায়, তখন কালো গিলাফে সোনালি অক্ষরের সেই নীরব মহিমা তাদের হৃদয়কে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে ভরে তোলে।

এই গিলাফ তাই কেবল ইতিহাসের স্মারক নয়, এটি মুসলিম হৃদয়ের এক অবিনাশী অনুভূতি, যা যুগের পর যুগ ধরে ঈমানের আলোকে উজ্জ্বল করে রেখেছে।

তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তারিখ আত-তাবারি,মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববির তত্ত্বাবধায়ক সংস্থার প্রকাশিত তথ্য।

লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram