

নানান প্রতিকুলতার এই দুনিয়ায় যুগে যুগে নানা আলামত, সংকট ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত মহাপ্রলয় বা কিয়ামতের এমন কিছু পূর্বলক্ষণ কোরআন ও হাদিসে ঘোষিত হয়েছে। যেগুলো সাধারণ সংকট বা বিপর্যয় থেকে অনেকটাই স্বতন্ত্র গুরুত্ব বহন করে। রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদিসে কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার যেসব নিদর্শন উল্লেখ করেছেন, তার প্রতিটি মানবসমাজকে সতর্ক করে আত্মপর্যালোচনা ও তাওবার দিকে আহ্বান করে।
নিম্নে আলোচ্য হাদিসে প্রিয় নবী (সা.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় কিয়ামতের পূর্বে সংঘটিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন তুলে ধরেছেন—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقْبَضَ الْعِلْمُ وَتَكْثُرَ الزَّلَازِلُ وَيَتَقَارَبَ الزَّمَانُ وَتَظْهَرَ الْفِتَنُ وَيَكْثُرَ الْهَرْجُ وَهُوَ الْقَتْلُ الْقَتْلُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمْ الْمَالُ فَيَفِيضَ.
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কায়িম হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। হারজ খুন-খারাবী। তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে।
(বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)
হাদিসের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) বর্ণিত এই হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত ঘনিয়ে আসার কয়েকটি বড় আলামতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। প্রথমেই তিনি বলেন, ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে—অর্থাৎ আলেম কমে যাবে, সঠিক জ্ঞান বিলুপ্ত হবে, মানুষ ধর্মীয় নির্দেশনা না বুঝে দ্বীনের নামে বিভ্রান্ত হবে।
এরপর উল্লেখ আছে ভূমিকম্পের আধিক্য, যা প্রকৃতির অস্থিরতার পাশাপাশি মানুষের নৈতিক পতন ও সমাজব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।
সময় সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সময় দ্রুত কেটে যাবে, মানুষের জীবনে বারাকাহ কমে যাবে, একেকটি বছর যেন মুহূর্তের মতো মনে হবে।
ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার অর্থ হলো, সমাজে অস্থিরতা, অশান্তি, বিভ্রান্তি, মিথ্যাচার ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে। যার বাস্তবতা আজকের সমাজে প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাচ্চি।
আর হারজ বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, হত্যা-হিংসা, খুন-খারাবি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছানো।
সবশেষে বলা হয়েছে, ধন-সম্পদ উপচে পড়বে; অর্থাৎ সম্পদের প্রাচুর্য থাকবে, কিন্তু এর সঙ্গে কৃতজ্ঞতা, ন্যায্য ব্যবহার ও নৈতিকতার ঘাটতি দেখা দেবে।
এই হাদিস আমাদের আহ্বান করে যে, সময়ের অস্থিরতার জন্য অন্যকে দোষারোপ করার আগে নিজের আমল, নৈতিকতা ও ঈমানকে পরখ করা জরুরি।
জ্ঞান বিলুপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে বেশি বেশি ইলম শিখা ও ছড়িয়ে দেওয়া। ফিতনা বাড়ার যুগে সত্যকে আঁকড়ে ধরা। হত্যা-হিংসায় ভরা পৃথিবীতে নিরাপত্তা ও দয়া প্রতিষ্ঠা করা। আর সম্পদ বাড়লে বিনয়ী ও আল্লাহর পথে ব্যয়কারী হওয়া।
আসুন, এই হাদিসের আলোকে আমরা নিজেদের সংশোধন করি, সমাজকে শান্তি ও সত্যের পথে ডাকি, এবং কিয়ামতের কঠিন দিনের পূর্বেই নিজেদের প্রস্তুত করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক: প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com

