

ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশে আলোচনার প্রথম ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। নৈশভোজের বিরতি দিয়ে আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। এখন দুই প্রতিনিধিদল লিখিত বার্তা বিনিময় করছে বলে জানা গেছে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দুই দেশের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও বিবিসি বলেছে, পরোক্ষ আলোচনার পর পাকিস্তান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একই কক্ষে বসে আলোচনা করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলেছে, সরাসরি নাকি পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। তবে হোয়াইট হাউসের বরাত দিয়ে এপি জানিয়েছে, সরাসরি আলোচনা হয়েছে।
ইসলামাবাদে আল জাজিরাকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলে, সেটাই প্রমাণ করবে যে উভয় পক্ষই আর সংঘাত পুনরায় শুরু করতে বা যুদ্ধকে আরো তীব্র করতে চায় না।
প্রকাশ্যে বাড়াবাড়ি রকমের ভঙ্গি প্রদর্শন আলোচনা প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। কিন্তু ঠিক এটাই আলোচনার টেবিলে নেই। বলতে পারেন, পাকিস্তানের কারণে এক ধরনের নমনীয়তা রয়েছে।’
এদিকে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা আল জাজিরাকে বলেছেন, লেবাননে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তাসহ মৌলিক শর্তগুলোর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
যদিও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি, তবে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা সীমিত রাখার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। শরিফ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এটাও বলেছেন, ইরানিদের দাবি করা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এখনো প্রাথমিক পর্যায় এবং এর অনেক কিছুই নিশ্চিত হওয়া বাকি, কিন্তু একটি বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে পাকিস্তানিরা খুবই আশাবাদী।
অবশ্য বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পুরোপুরি অবিশ্বাস’ নিয়ে ইরান আলোচনায় বসছে বলে জানিয়ে রেখেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এদিকে সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আবাস আসলানি বলেছেন, ‘বর্তমান আলোচনা শেষ পর্যায় নিয়ে নয়, বরং একটি প্রক্রিয়ার সূচনা।
কিছুদিন আগে যখন আমরা যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা শুনছিলাম, তখন কেউ কেউ ভেবেছিলেন যে এটি একটি চূড়ান্ত চুক্তি। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পথটি বন্ধুর, তবে অবরুদ্ধ নয়।’
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা নিয়ে ইরানিরা ‘খুবই সন্দিহান’ : কয়েক দিন ধরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আল জাজিরা ইরানিদের সঙ্গে কথা বলেছে। আল জাজিরার মতে, কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে একটি ক্ষীণ আশা এখনো রয়েছে, যা যুদ্ধের ছায়া দূর করতে পারে। আর ইরানিরা এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে খুবই সন্দিহান। এটি আদৌ টিকবে কি না, তা নিয়েও তারা সন্দিহান। তবে অতিরিক্ত একটি আশা রয়েছে যে শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক আলোচনা সফল হলে নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হবে। ইরানিদের অর্থনৈতিক অবস্থার ক্ষেত্রে এটি খুবই অর্থবহ হবে, যা বছরের পর বছর ধরে অবনতি হয়েছে।
শেহবাজের সঙ্গে দুই পক্ষের আলাদা বৈঠক : ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শুরুর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বৈঠকে ভ্যান্সের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, এ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি। এর আগে এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে দিনের শুরুর দিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধিদলও শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে। এই বৈঠকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান অসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও উপস্থিত ছিলেন।
তহবিল অবমুক্তকরণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি : ইরানের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র গতকাল শনিবার জানিয়েছে, কাতার ও অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে, কিন্তু একজন মার্কিন কর্মকর্তা দ্রুত এই দাবি অস্বীকার করেছেন। ইরানের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র ইসলামাবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় একটি চুক্তিতে পৌঁছার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই কথিত পদক্ষেপকে ‘আন্তরিকতা’র লক্ষণ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। সূত্রটি বলেছে, মার্কিন পক্ষের কাছে পাঠানো বার্তায় এটি ইরানের অন্যতম একটি দাবি ছিল এবং তেহরান সম্পদগুলো ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পেয়েছে। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, সম্পদগুলো অবমুক্ত করা হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যা আলোচনার একটি মূল বিষয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় একটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কাতারের কাছে থাকা জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলারের ইরানি তহবিল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি। মূলত আট বছর আগে তহবিল জব্দ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ২০১৮ সালে জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালে ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের মিত্র ফিলিস্তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী হামাসের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামলার পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন তহবিলটি পুনরায় জব্দ করে।
পাকিস্তান সম্পর্কে বিশ্ব মনোভাব এখন ৭০ শতাংশ ‘ইতিবাচক’ : বিশ্বমঞ্চে দেশটির ভাবমূর্তি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পাকিস্তানের প্রতি বিশ্ববাসীর দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা এখন ইতিবাচক মনোভাবে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ইপসোসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত মাসের শেষ দিকেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিশ্বে ৯০ শতাংশ মানুষের নেতিবাচক ধারণা ছিল। তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন পাকিস্তানের বিষয়ে ইতিবাচক মত দিচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা আজ রবিবারও চলতে পারে : ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা আজ রবিবারও হতে পারে। গত রাতে ইসলামাবাদে থাকা তাসনিম নিউজের সংবাদদাতা বলেন, সেখানে মুখোমুখি আলোচনার একটি ধাপ শেষ হয়েছে। বর্তমানে দুই প্রতিনিধিদল একে অন্যের সঙ্গে লিখিত খসড়া বিনিময় করছে। শনিবারের আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, সে বিষয়ে যে তারা একমত সেটি পরিষ্কার করতেই লিখিত বার্তা বিনিময় করছে তারা।
তিনি বলেন, শনিবার কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা আলোচনায় দুই দেশের বিশেষজ্ঞ দলগুলো অংশ নেয়। সরাসরি আলোচনার একটি পর্যায় শেষ করার পর তারা এখন আলোচিত বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে লিখিত নথিপত্র বিনিময় করছে।
সূত্র : আল জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, এপি
