

ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক ভাঙনের মুখে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি। রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ফলে সম্পর্কে টান ধরার মধ্যে তিনি এই মন্তব্য করলেন। নিকি হ্যালি বলেন, যদি চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উচ্চাকাক্সক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় আমেরিকা, তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে আবার সঠিক পথে আনা অত্যন্ত জরুরি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। বুধবার নিউজউইকে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে হ্যালি লিখেছেন, ভারতকে কখনোই চীনের মতো প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা উচিত নয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে শুল্ক কিংবা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে মার্কিন ভূমিকার প্রশ্নে দুই বৃহত্তম গণতন্ত্রের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে দেয়া যাবে না। কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা আগেই ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্কের অতিরিক্ত। এর আগে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মার্কিন ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও গভীর হয়। নিকি হ্যালি লিখেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য চীনকে পেছনে ফেলা এবং শক্তির মাধ্যমে শান্তি অর্জন করা। তা বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য খুব কম।দৈনিক পত্রিকা সাবস্ক্রিপশন
যদিও তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন, তবুও হ্যালি তার রিপাবলিকান সহকর্মীর কড়া সমালোচক হিসেবে রয়ে গেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতকে সেই মূল্যবান স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে দেখা উচিত, যা সে প্রকৃতপক্ষেই। চীন এখনও রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম গ্রাহক। তার পরও রাশিয়ান তেল কেনার কারণে তারা কোনো নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, এশিয়ায় চীনা প্রভাব মোকাবিলার একমাত্র সক্ষম দেশটির (ভারতের) সঙ্গে গত ২৫ বছরের অগ্রগতি ধ্বংস করে দেয়া কৌশলগত বিপর্যয় হবে। হ্যালি জোর দিয়ে বলেন, স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওয়াশিংটনকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইন চীন থেকে সরিয়ে নিতে ভারতই সহায়তা করতে পারে। তিনি লিখেছেন, যখন ট্রাম্প প্রশাসন উৎপাদনশিল্প আমেরিকায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন ভারত একমাত্র দেশ, যার সম্ভাবনা আছে চীনের মতো স্কেলে উৎপাদন করার। বিশেষত যেসব পণ্য দ্রুত বা কার্যকরভাবে আমেরিকায় তৈরি করা যায় না। এর মধ্যে আছে টেক্সটাইল, সস্তা মোবাইল ফোন ও সোলার প্যানেল। প্রতিরক্ষা খাতে, ইসরাইলসহ মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে ভারতের বাড়তে থাকা সামরিক সম্পর্ক কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজারকেই শক্তিশালী করছে না, বরং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্যও ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের বাড়তি প্রভাব ও নিরাপত্তা ভূমিকা অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে, যখন আমেরিকা সেখানে সেনা ও অর্থ কমাতে চায়। ভারতের অবস্থান চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে হওয়ায় বড় ধরনের সংঘাতের সময় এটি বেইজিংয়ের বিকল্প সীমিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ভারতের গুরুত্ব আরও গভীর। ২০২৩ সালে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশে পরিণত হয়েছে। ভারতের তরুণ শ্রমশক্তি চীনের বার্ধক্যপীড়িত জনসংখ্যার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে ভারতের উত্থান চীনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। হ্যালি লিখেছেন, এটি চীনের বৈশ্বিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। তিনি বলেন, সহজভাবে বলতে গেলে ভারতের শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সংকুচিত হতে বাধ্য হবে। কিন্তু চীনের মতো ভারতের গণতান্ত্রিক উত্থান মুক্ত বিশ্বের জন্য কোনো হুমকি নয়। উল্লেখ্য, নিকি হ্যালি ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয়-আমেরিকান, যিনি কোনো প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
