ঢাকা
২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৫:১৩
logo
প্রকাশিত : মে ২১, ২০২৬

শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে করণীয়

কসবা একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। এ উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন ভারতীয় সীমান্তবর্তী। সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলোর কিছু সংখ্যক বাচ্চা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে/ মাদ্রাসায় গিয়ে হঠাৎ পড়ালেখা থেকে দূরে সরে যায়। প্রথমে টানা কয়েকদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। মাঝে মধ্যে আবার এক/দুই দিন স্কুলে আসে। কিন্তু তখন আর তার ভাল লাগে না। এর কারণ হতে পারে, দীর্ঘ টানা কয়েকদিন স্কুলে অনুপস্থিতির কারণে বিভিন্ন বিষয়ের পড়া থেকে দূরে যায় এবং পরে ক্লাসের নতুন পড়ার সাথে খাপ খাইতে পারে না। ফলে ক্লাসে পড়া না পারার কারণে শিক্ষকের বকুনি এবং অন্য নিয়মিত স্কুলগামী বাচ্চাদের সাথে পড়াশোনায় পেরে উঠতে না পারায় সে স্কুল ফাঁকি দিতে থাকে। আবার পরিবারে বাবা-মা অশিক্ষিত হওয়ায় অথবা আর্থিক অনটন থাকায় তারা সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অনেক পরিবারের বাবা-মা তাদের সন্তানদের পারিবারিক কাজে ব্যস্ত রাখায় তাদের সন্তানরা আস্তে আস্তে স্কুল/মাদ্রাসা এবং তাদের স্কুল/মাদ্রাসাগামী বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়। আর এভাবে সে ঝরে যেতে থাকে।

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অনেক পরিবার মাদক ও চোরাচালানের সাথে যুক্ত থাকে। একটি চালান যে কোন উপায়ে সফলভাবে বের করতে পারলে অনেক কাঁচা টাকা রাতারাতি ইনকাম করা যায়। এই মাদক ও চোরাচালান ব্যবসায়ীরা কাঁচা টাকার লোভ দেখিয়ে গরীব-অসহায় লোকদের ব্যবহার করে ভারতীয় কাঁটা তার ভেদ করিয়ে বিএসএফ এর গুলির মুখে ঠেলে দিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিল করে। বিনিময়ে এই গরীব-অসহায় মানুষগুলো মাত্র কয়েক ঘন্টা ডিউটি করে কয়েক দিনের রোজগার করে ফেলে। প্রথমে এগুলো করে পরিবারের বড়রা। পরিবার থেকে শিখে এই বাচ্চাগুলোও ধীরে ধীরে এই পেশায় জড়িয়ে যায়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং আশ্চর্যজনক বিষয় হল পরিবারের নারী সদস্যরা এই কুকর্মে জড়িয়ে যায় এবং তাদের পরিবারের সন্তানেরা মাদকের ব্যবসা করে এবং মাদকাসক্ত হয়ে পরিবারের জন্য মরণাস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে সীমান্তবর্তী শতশত পিতার মাতার আহাজারি শুনতে হয়েছে এবং তাদের সন্তানকে রিহ্যাব এবং পূর্ণবয়স্ক সাপেক্ষে জেল-হাজতে পাঠাতে হয়েছে। অথচ সামান্য কাঁচা টাকার লোভে না পড়ে তারা যদি সচেতন হয়ে কষ্ট করে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা করাতেন তবে বর্ডার বাণিজ্য কমে যেত এবং স্কুলে ঝরে পরা শিশুর হার কমত।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ করেছি। কিছু গরীব পরিবার যাদের সন্তানেরা স্কুলে পড়ালেখা করে তাদেরকে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গুলোতে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছি। কয়েকটি পরিবারে সেলাই মেশিন দিয়েছি যাতে এই মেশিন দিয়ে সেলাই কাজ করে সন্তানের পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পারে। কয়েকটি পরিবারে বিভিন্ন এনজিও থেকে হাঁস-মুরগী পালন ও গবাদি পশু পালনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিয়মিত ঐ এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের মাধমে তাদের সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজ খবর নিয়েছি। সীমান্তবর্তী এলাকায় এই তদারকি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার এবং স্কুলে অনুপস্থিতির হার অনেকাংশে কমে গিয়েছে।

সীমান্তবর্তী স্কুল গুলোতে ঝরে পড়ার হার কমাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে স্কুলগামী রাস্তা তৈরী এবং মেরামত, স্কুলের বাউন্ডারি তৈরি, মাঠ সংস্কার, নতুন খেলার মাঠ প্রস্তুতকরণ বাচ্চাদের স্কুলগামী করতে দারুণ ভূমিকা রেখেছে। যদি সকল বাচ্চাদের একই ড্রেস দেওয়া যায় এবং মিড ডে মিল চালু করা যায় তাহলে ঝরে পড়া শিশুর হার আরো কমানো যাবে। সেই সাথে তাদের যে উপবৃত্তি প্রদান কার্যক্রম চালু রয়েছে, সেটি তাদের স্কুলগামী করতে অনেকাংশ ভূমিকা রাখছে।

কসবাতে বেশ কতকগুলো আশ্রয়ণ প্রকলপ রয়েছে। এখানে গরীর-অসহায় মানুষগুলো দিনের আলো ফুটলেই বের হয়ে যায় কাজের সন্ধানে। কেউ যায় অটোরিক্সা চালাতে, সিএনজি চালাতে, কেউ যায় বাস-ট্রাকে ড্রাইভারি / হেল্পারি করতে। আবার কেউ যায় ক্ষেতে-খামারে। পরিবারের মহিলারা বসে থাকে না। সবাই কোনো না কোনো কর্মে বেরিয়ে পড়েন। খুব কম সংখ্যক মানুষ দিনের বেলা আশ্রয়নের ঘরগুলোতে থাকে। আবার কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর হাইওয়ের পাশে হওয়ায় এবং স্কুল/মাদ্রাসাগুলো এখান থেকে দূরে থাকায় তাদের বাচ্চাদের একাকী স্কুলে দিতে চান না বা স্কুলগামী হলেও নিয়মিত অনুপস্থিত থাকে এবং একসময় স্কুল/মাদ্রাসা থেকে ছিটকে পড়ে। আবার অনেক শিশু বিভিন্ন দোকান/ হোটেলে কাজ করে। শিশু শ্রম বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারলে প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিশুর হার অনেকাংশে কমানো যাবে।

এছাড়া নিয়মিত মা সমাবেশ এর মাধ্যমে অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা ,আনন্দপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম বন্ধ, হাতে কলমে শিক্ষা, সমাজে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার মাধ্যমে আমরা ঝরে পড়া শিশুর হার কমাতে সক্ষম হব। শিক্ষার মানোন্নয়নে উপরোক্ত বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অনেক বিদ্যালয়ে এসেম্বলি করার মত মাঠ নেই। আবার মাঠ থাকলেও সংস্কারের অভাবে সেখানে কোনো কিছু করা যায় না, সেগুলো সংস্কার ও মেরামত করে দিলে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইভটিজিং বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখলে এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ সচেতন থাকলে নিয়মিত উপস্থিতির ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভবন না থাকায় শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি এবং নোংরা রাজনীতি বন্ধ করলে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ ফিরে আসবে। স্কুলে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ সহ স্কুলে মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের তালিকা করে তাদেরকে ভালোভাবে পাঠদান করাতে পারলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি স্কুলে লাইব্রেরি স্থাপন করে যেখানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের অন্তত একঘন্টা লাইব্রেরীতে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে পারলে খুবই ভাল হয়।

আধুনিক ও মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকদের ক্লাস নিতে হবে। ক্লাসে সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষকদেরও উপস্থিত থাকতে হবে। কসবা উপজেলাতে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সকাল ৯:০০ টায় স্কুলে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে সেটির ছবি ৯:২০ এর মধ্যে শিক্ষা অফিসারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেন এতে করে শিক্ষকদের সঠিক সময়ে উপস্থিতির হার শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। আবার ছুটির সময়ে শিক্ষা অফিসার Randomly কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ভিডিও কলে ফোন দিয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত হন। কসবা উপজেলাতে শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বলা হয়েছে, তাদের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাড়িতে হোম ভিজিট করার জন্য। এক্ষেত্রে শিক্ষকরা ৮/১০ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে তাদের হোম ওয়ার্ক দিবেন এবং সেটি আদায় কর নিবেন। গ্রুপ ভিত্তিক (৮/১০ জন) পড়া কেউ একজন না পারলে ঐ গ্রুপের দায়িত্ব হবে না বুঝা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দেয়া, এতে সহযোগিতা করবেন গ্রুপের শিক্ষক। এভাবে স্কুলে পাঠদানে মনোযোগী হলে শিক্ষার মান বাড়বে। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতন/ভাতা/অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাড়াতে পারলে তারাও আগ্রহী আগ্রহী হবেন। অভিভাবকগণ যদি তাদের সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজ-খবর রাখেন তবে শিক্ষিার্থীরাও আড্ডাবাজি এবং অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করে পড়ালেখায় মনোযোগী হবে। আর এগিয়ে যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত হবে আমাদের সোনামণিদের।

লেখক
মোঃ ছামিউল ইসলাম
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
৩৬তম বিসিএস (প্রশাসন ক্যাডার)

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram