

২০২৬ সালের একটি মে মাস। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন। চারদিকে আনন্দের রোল, মিষ্টি বিতরণ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিপিএ-৫ এর জয়গান। কিন্তু এই উৎসবের আবহেও যদি একজন ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ পাওয়া শিক্ষার্থীকে বলা হয় একটি সাধারণ ছুটির দরখাস্ত লিখতে বা নিজের দেশ সম্পর্কে পাঁচটি মৌলিক বাক্য বলতে—সেখানে অনেকেই থমকে দাঁড়াচ্ছে। এই দৃশ্যটিই হলো আধুনিক বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে করুণ প্রহসন। আমরা কি তবে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা কেবল পরীক্ষার হলে বমি করে আসতে জানে, কিন্তু বাস্তব জীবনের ময়দানে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র?
আমরা আজ মেধা পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে কেবল ‘গ্রেড পয়েন্ট’কে বেছে নিয়েছি। শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতরের গুণাবলিকে বিকশিত করা, কিন্তু তা এখন কেবল উচ্চ সিজিপিএ (CGPA) বা জিপিএ অর্জনের একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। সার্টিফিকেটের এই বিশাল স্তূপ আসলে আমাদের প্রকৃত অযোগ্যতাকেই ঢেকে রাখছে। এই ‘গোল্ডেন উন্মাদনা’ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এক বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ কঙ্কালে পরিণত করেছে।
গ্রেডের প্লাবন বনাম দক্ষতার খরা
২০২৫ সালের শেষার্ধে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ এডুকেশন ওয়াচ’ এবং একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার প্রায় ৩৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই অনুপাতে উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বাড়েনি। ‘বিশ্বব্যাংক’-এর একটি ডাটা অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে প্রায় ৪৬% তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে মৌলিক দক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হন।
২০২৬ সালের প্রারম্ভিক কর্মসংস্থান ডাটা বলছে, কর্পোরেট সেক্টরে নিয়োগদাতাদের প্রায় ৭৫% অভিযোগ করেছেন যে, সর্বোচ্চ জিপিএধারী প্রার্থীরাও ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রাখেন না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ‘এ প্লাস’ পেলেও জাতীয় পর্যায়ে গবেষণার হার (Research Output) দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের চেয়েও নিচে। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, আমরা ‘গ্রেড’ তৈরি করছি কিন্তু ‘মেধা’ তৈরি করছি না। আমরা শিক্ষার সংখ্যাতাত্ত্বিক সাফল্যে এতই বিভোর যে, শিক্ষার গুণগত মান আজ আইসিইউতে (ICU) পড়ে আছে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের কারিকুলাম নকশা করা হয়েছে এমনভাবে যা কেবল আদেশ পালনকারী ‘কেরানি’ তৈরি করতে পারে, সৃজনশীল ‘উদ্যোক্তা’ নয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী অনার্স শেষ করেও জানে না কীভাবে একটি গবেষণাপত্র (Research Paper) বা প্রস্তাবনা তৈরি করতে হয়।
বাস্তবিক উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র ২০% শুদ্ধভাবে বাংলা ও ইংরেজিতে অনুচ্ছেদ লিখতে পেরেছেন। বাকিরা হয়তো তত্ত্ব মুখস্থ করেছেন, কিন্তু ভাষার প্রায়োগিক ব্যবহার শিখেননি। এই যে ‘পরীক্ষার খাতা ভরানোর শিক্ষা’—এটিই আমাদের মেধাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আমরা কি কেবল সনদের লোভে পড়ছি, নাকি জীবনের পূর্ণতা পাওয়ার জন্য?
বারুদের গন্ধ বনাম সৃজনশীলতার অভাব
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা—ইরান, ইসরায়েল কিংবা পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার লড়াই—বিশ্বের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিকে (Knowledge Economy) নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই যুগে টিকে থাকতে হলে মুখস্থ বিদ্যা নয়, প্রয়োজন উদ্ভাবনী শক্তি। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরজ, কিন্তু সেই জ্ঞান হতে হবে কর্মমুখী ও হিতকর।
২০২৬ সালের রমজান আমাদের শিখিয়েছিল ধৈর্যের গভীরতা ও প্রজ্ঞার গুরুত্ব। কিন্তু আমাদের পড়াশোনায় সেই গভীরতা নেই, আছে কেবল দ্রুত রেজাল্ট পাওয়ার ব্যাকুলতা। ‘সুবিধাবাদী দেশপ্রেম’ বা ‘যান্ত্রিক ইবাদত’ এর মতোই আমাদের ‘শিক্ষা’ আজ একটি মেকি পণ্যে পরিণত হয়েছে। দাউদ ইব্রাহিম হাসানের দর্শন অনুযায়ী—যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, সেই শিক্ষা আসলে এক ধরণের মানসিক পরাধীনতা। আমাদের প্রজ্ঞার অভাব আজ আমাদের এক ধরণের ‘শিক্ষিত পঙ্গুত্ব’র দিকে নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরিত্রের ইনসাফ বনাম গুণগত শিক্ষা
বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের কেবল শিক্ষিতের হার বাড়ালে হবে না, আমাদের নাগরিকদের ‘চরিত্রের ইনসাফ’ এবং ‘ব্যবহারিক জ্ঞান’ নিশ্চিত করতে হবে। শৃঙ্খলাই জীবনের মূল, আর সেই শৃঙ্খলার শ্রেষ্ঠ প্রয়োগ হলো শিক্ষার গুণগত মান রক্ষা করা। আমরা যদি প্রফেশনাল লাইফে অনেক বড় কর্মকর্তা হই কিন্তু নিজের কাজের ক্ষেত্রে নূন্যতম পারদর্শিতা না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন সার্থক নয়।
২০২৬ সালের বাংলাদেশের স্মার্ট এডুকেশন ফ্রেমে যদি আমরা ‘স্কিল-বেজড অ্যাসেসমেন্ট’ বা দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক না করি, তবে আমরা একদল সনদধারী অযোগ্য নাগরিকের জাতিতে পরিণত হব। জবাবদিহিতা কেবল শিক্ষকদের নয়, প্রতিটি অভিভাবকের তার সন্তানের প্রতি—তারা কি গ্রেড খুঁজছেন নাকি জ্ঞান? পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদী কাজ তখনই সফল হয় যখন সেখানে সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তার নাগরিকদের প্রজ্ঞায়, জিপিএ-র প্লাবনে নয়।
প্রযুক্তির স্বর্ণখাঁচা বনাম সৃজনশীল মুক্তি
প্রযুক্তি আমাদের বলছে জগত এখন এআই (AI) এর দখলে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি এখন সেকেন্ডে আপনাকে অ্যাসাইনমেন্ট লিখে দিচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তি কি পারবে আপনার মধ্যে সেই ‘মনুষ্যত্ব’ বা ‘বিচারবুদ্ধি’ তৈরি করতে যা কেবল সুশিক্ষায় অর্জিত হয়? প্রযুক্তি আমাদের মেধাকে হয়তো তুখোড় করছে, কিন্তু আমাদের মৌলিক সৃজনশীলতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আমাদের প্রজ্ঞা আজ আমাদের বলছে—খাঁচা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত খাঁচাই।
নিজের মুখোমুখি হওয়া মানে হলো এই গ্রেডের মোহ থেকে বেরিয়ে আসা। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের যে শৃঙ্খলার পাঠ দেয়, তা কেবল পিটি প্যারেডের জন্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য। জিপিএ-৫ পাওয়ার চেয়ে একটি নতুন আইডিয়া বা একটি ভালো কাজ করাই হলো প্রকৃত আভিজাত্য। গোপনীয়তা রাখা ভালো, কিন্তু সেই গোপনীয়তা যখন মেধাহীনতাকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়, তখন তা আধুনিক ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কিছু নয়।
এক নতুন জাগরণের প্রতীক্ষা
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের একটি রূঢ় সত্য বুঝতে হবে—পৃথিবীর কোনো গোল্ডেন সার্টিফিকেট আপনার অযোগ্যতাকে সারাজীবন ঢাকতে পারবে না। ‘দ্য গোল্ডেন কেজ’ বা এই যান্ত্রিক সভ্যতার মায়া আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে যে— "গ্রেডই সব।" কিন্তু সত্য হলো, আপনার কাজ এবং আপনার সৃজনশীলতাই আপনার আসল পরিচয়।
শিক্ষার মৃত্যু আসলে এক ধরণের জাতীয় বিপর্যয়। আপনি যদি কেবল সার্টিফিকেটের জন্য আপনার জগতকে মাপেন, তবে আপনি কখনোই জ্ঞানের আসল স্বাদ পাবেন না। প্রজ্ঞা কেবল এআই-এর ডাটাবেজে নেই, প্রজ্ঞা আছে জানার আকাঙ্ক্ষায় এবং কাজ করে দেখানোর সাহসে। মনে রাখবেন, খাঁচা সোনার হলেও তা শেষ পর্যন্ত খাঁচাই; আর প্রাণের আসল সৌন্দর্য তার অবারিত ও জ্ঞানভিত্তিক ডানা ঝাপটানোয়। আসুন আমরা গ্রেডের পিছু না ছুটে গুণের পিছু ছুটি। পৃথিবী আপনাকে আপনার ‘গ্রেড শিট’ দেখে নয়, বরং আপনার ‘পারদর্শিতা’ আর ‘মনুষ্যত্ব’ দেখে বিচার করবে।
লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
