ঢাকা
১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১:৪৫
logo
প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৯, ২০২৫

ধ্বংসস্তূপের অন্তরালে দুর্নীতি, কে একমাত্র দোষী?

সরকারি হাসপাতাল কিংবা বিদ্যালয়—এগুলো কেবল ইট-পাথরের স্তূপ নয়; এগুলো একটি জাতির সামষ্টিক স্বপ্নের স্থাপত্য, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার আশ্রয় আর শিক্ষার আলো এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহে জন্ম দেয় ভবিষ্যৎকে। দরিদ্র মানুষের কাছে এগুলোই শেষ ভরসার ঘর, আর শিশুদের কাছে প্রথম স্বপ্নদ্বার। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আশ্রয়স্থলগুলোর ভিত্তি গড়ার শুরুতেই যেন কোনো অদৃশ্য ক্ষত ছড়িয়ে পড়ে—ঠিকাদার নির্বাচনে স্বচ্ছতার সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব আর জবাবদিহিতার ঘাটতি মিলিয়ে জন্ম দেয় সেই গভীরতম ফাটল। ফলস্বরপ মানহীন নির্মাণকাজ শুধু স্থাপনার দেহকেই দুর্বল করে না, বরং জাতির দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের ওপরও সৃষ্টি করে অদৃশ্য কিন্তু গভীর এক ঝুঁকি।

এই দুর্নীতি কেবল কোটি কোটি টাকার অপচয় নয়, এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থাকে চরমভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। যখন একটি সদ্যনির্মিত ভবনে ফাটল দেখা দেয়, তখন সেই ফাটল আক্ষরিক অর্থে দেশের অগ্রগতির স্বপ্নেও প্রতিফলিত হয়। এই "স্বপ্নের নির্মাণে দুর্নীতি" আজ এক জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে, যা পুরো সমাজকে নীরবে গ্রাস করছে। এই করুণ গাথা শুনতে গেলে কেবল চোখ নয়, হৃদয়ের কানও খোলা রাখতে হয়।

সরকারি হাসপাতাল বা স্কুল নির্মাণে স্বচ্ছতার অভাব কেন ঘটে এবং কেনই বা এই নির্মাণ কাজ মানহীন হয়, এর পেছনে ৫০টিরও বেশি গভীর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক কারণ রয়েছে। এই কারণগুলো যেন এক কালো জাল, যা যোগ্যতাকে অস্বীকার করে অযোগ্য হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়।

প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব। দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়, ফলে যোগ্য ঠিকাদাররা বাদ পড়েন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) একটি সমীক্ষা (২০২৩) অনুসারে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রায় ১/৩ অংশ লেনদেন অবৈধ পথে হয়। ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য শর্ত শিথিল করা হয় এবং ভুয়া অভিজ্ঞতা বা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয়।

বিশ্বব্যাংকের (World Bank) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্পের মানহীনতার কারণে প্রকল্পের গড় দীর্ঘস্থায়ীত্ব প্রায় ৪০% কমে যায়। নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে টেন্ডার জমা দিয়ে কাজ পাওয়ার পর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) একটি গবেষণা দেখায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় অতিরিক্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, মানহীন নির্মাণ এবং তদারকির অভাব এই সঙ্কটকে আরও গভীর করে। নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট, লোহা (রড) এবং অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (NHA) একটি রিপোর্ট অনুসারে, নির্মিত সরকারি ভবনের প্রায় ৫০% নির্মাণ ত্রুটির শিকার। প্রকৌশলীদের অসততা এবং নির্মাণ সাইটে নিয়মিত পরিদর্শন না করা—এই নীরবতা দুর্নীতিকে সম্মতি জানায়। নির্মাণের সময় প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয় এবং এর ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার ২০২১-২০২২ অর্থবছরে গড়ে মাত্র ৭০%, যা সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। শ্রম সংস্থা (ILO) এর তথ্য অনুসারে, নির্মাণজনিত দুর্ঘটনায় বাৎসরিক বৃদ্ধির হার ১০% এর বেশি। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর দোষ ধরবার সময়কাল (Defect Liability Period) সঠিকভাবে পালন না করাও এক সাধারণ চিত্র। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BUET) গবেষণা অনুসারে, সরকারি প্রকল্পে ব্যবহৃত রডের মান প্রায় ৩৩% ক্ষেত্রে নির্ধারিত মানের চেয়ে নিম্ন।

এই দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না, এটি সাধারণ জনগণের মনে আস্থার চরম ফাটল তৈরি করে। সাধারণ মানুষ বা সুবিধাভোগী সংস্থা কর্তৃক নির্মাণের মান নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগের অভাব থাকে। নির্মাণ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) অতিরিক্ত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিবাজদের শাস্তি না হওয়া বা বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (SDG) রিপোর্ট অনুসারে, অবকাঠামোর মান বজায় না রাখতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

দীর্ঘস্থায়ীত্বের বদলে স্বল্পমেয়াদী লাভকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা পুরো সমাজকে ভবিষ্যতের ঝুঁকিতে ফেলে। ঠিকাদার নির্বাচনে এই স্বচ্ছতার অভাব এবং এর ফলস্বরূপ মানহীন নির্মাণ কাজ কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, এটি দেশের ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সরকারি অবকাঠামোর মানহীনতা, নির্মাণের নিরাপত্তা সংকট এবং আর্থিক ক্ষতির একটি ধারাবাহিক উর্ধ্বগতির চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ২০১৫ সালে যেখানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (NHA)–এর ভিত্তিতে সরকারি ভবনের দীর্ঘস্থায়ীত্ব হ্রাসের হার ছিল ২৫%, ২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ৪০%, এবং ২০২৫ সালে পৌঁছে যায় ৫৫%-এ। ভবিষ্যৎ অনুমানে দেখা যায়, ২০৩০ সালে এই ক্ষয়ক্ষতির হার ৭০%, ২০৩৫-এ ৮৫%, এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তা ১০০%-এ পৌঁছাতে পারে—যা নির্দেশ করে বিদ্যমান মানহীন নির্মাণ চর্চা অব্যাহত থাকলে টেকসই ভবনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়তে পারে।

একইভাবে, শ্রম সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী নির্মাণজনিত দুর্ঘটনা ২০১৫ সালে মাত্র ৫% বৃদ্ধি পেলেও ২০২০ সালে তা ১০%, ২০২৫-এ ১৫% এবং অনুমান অনুযায়ী ২০৩০, ২০৩৫ ও ২০৪০ সালে তা যথাক্রমে ২০%, ২৫% ও ৩০%—অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতার ভয়ংকর প্রতিফলন। পাশাপাশি, মানহীন নির্মাণের কারণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ২০১৫ সালে ছিল ১৫%, যা ২০২০ সালে ২৫% এবং ২০২৫ সালে ৩৫%-এ উন্নীত হয়। ভবিষ্যৎ অনুমান অনুযায়ী, এ ব্যয় ২০৩০ সালে ৫০%, ২০৩৫-এ ৬৫% এবং ২০৪০ সালে ৮০%-এ পৌঁছাতে পারে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল চাপের ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়—মানহীন নির্মাণ, তদারকি সংকট, দুর্নীতি এবং প্রকৌশলগত অনিয়ম অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনকল্যাণ ব্যবস্থা এক মারাত্মক সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে।

এই পরিসংখ্যানগুলি এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরে। অর্থনৈতিক মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি এই দুর্নীতি চলতে থাকে, তবে ২০৪০ সাল নাগাদ সরকারি ভবনের দীর্ঘস্থায়ীত্ব প্রায় ১০০% হ্রাস পাবে। অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বলছে, মানহীনতার কারণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ২০৪০ সাল নাগাদ ৮০% এ পৌঁছাতে পারে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) একটি বিশ্লেষণ দেখায়, শিক্ষার গুণগত মান খারাপ হওয়ায় মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) প্রতিবেদন অনুসারে, দুর্বল অবকাঠামো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেশকে পিছিয়ে দেয়।

ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের নীলনকশা যেন আজই স্পষ্ট—শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির প্রান্তে ঠেলে যাবে, জনস্বাস্থ্য ডুববে গভীর বিশৃঙ্খলায়, আর সমাজজুড়ে আস্থার সুতায় জন্ম নেবে অগণিত ছিদ্র। অর্থনৈতিক অপচয়ের ঢেউ আরও ফুলে-ফেঁপে উঠবে। বিবিএস (২০২৩) জানায়, নিম্নমানের অবকাঠামো শুধু ভবনের দেয়াল নয়—মানুষের দুর্ভোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শিক্ষা-বঞ্চনার নীরব ইতিহাসও নির্মাণ করে।

আজ যে দুর্নীতির বিষবীজ মাটিতে ফোঁটা ফোঁটা বোনা হচ্ছে, আগামীকাল তা এক ভঙ্গুর সমাজের বিষাক্ত বৃক্ষে পরিণত হবে—যেখানে নিরাপত্তাহীন স্তম্ভের নিচে চাপা পড়বে আস্থার শেষ আলোটুকুও। নির্মাণশিল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আর নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ছাড়া এই আসন্ন বিপর্যয় থামানোর কোনো পথ নেই।
এই তিক্ত গাথা আমাদের কোমল সত্যটি মনে করিয়ে দেয়—যদি ভিত্তিই হয় নড়বড়ে, তবে কোনো স্বপ্নই প্রাসাদের আকারে টিকে থাকে না।তাই আজ সময় এসেছে শপথ নেবার—
ইট-পাথরের ভাঁজে নৈতিকতার শিরা বুনে দাও।
দুর্নীতির পচা দেয়াল ভেঙে নতুন স্বপ্নের স্থাপত্য তোলো।
যারা আজ দুর্বল নির্মাণের নামে অপরাধ করে, তাদের জন্য আর কোনো ক্ষমা নয়—
কারণ আস্থার ফাটল ধরলে একটি জাতি শুধু ভেঙে পড়ে না, ধ্বংস হয়ে যায় ভবিষ্যতের নকশাও।

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1736 786915, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram