

২০২৬ সালের এক বসন্তের সকাল। ঢাকার একটি আধুনিক পাড়ার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বারান্দায় একদল প্রাণোচ্ছল শিশু এমন এক উৎসবের আনন্দে মেতেছে, যা মূলত বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে গড়ে উঠেছে। তাদের কথোপকথনে আন্তর্জাতিক ভাষার আধিক্য এবং সাজপোশাকে বিশ্বজনীন ফ্যাশনের প্রভাব স্পষ্ট, যা বর্তমান সময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও বিশ্বমুখী জীবনধারারই এক প্রতিফলন। অন্যদিকে, মাটির গন্ধে মাখা আমাদের নিজেদের লোকজ উৎসবগুলো তাদের কাছে ‘পুরনো’ বা ‘গ্রাম্য’। আমরা কি তবে উন্নয়নের মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজেদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ছোট মনে করতে শুরু করেছি? কেন অন্য দেশের উৎসব বা চালচলন নকল করাটা আজ আমাদের কাছে আভিজাত্যের মানদণ্ড? নিজের ভাষা বা পোশাক পরতে লজ্জা পাওয়ার এই যে হীনম্মন্যতা, এটি কি আমাদের এক পরিচয়হীন জাতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?
সাংস্কৃতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (Cultural Hegemony)। আমরা যখন নিজের সংস্কৃতির চেয়ে অন্যের সংস্কৃতিকে শ্রেয় মনে করি, তখন তাকে বলা হয় আত্মবিস্মৃতি। ২০২৫ সালের একটি মনস্তাত্ত্বিক সমীক্ষা এবং ‘কালচারাল বিহেভিয়ার ডাটা’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহুরে তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৬৪% মনে করেন যে, ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষার মিশেলে কথা বলাটা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এই মনস্তত্ত্বের মূলে রয়েছে এক ধরণের গভীর হীনম্মন্যতা। আমরা মনে করি, বিদেশি সংস্কৃতি গ্রহণ করলেই আমরা ‘আধুনিক’ হবো। অথচ আধুনিকতা মানে হলো বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিকতা, যা নিজের শেকড় আঁকড়ে ধরেও অর্জন করা সম্ভব।
আমরা কি নিজেদের চিনতে লজ্জা পাই? আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার বিকৃতি বর্তমানে এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একুশে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনটুকুই যেন আমাদের ভাষা-চেতনার একমাত্র বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে; অথচ বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমরা আমাদের সন্তানদের অবলীলায় শিখিয়ে দিচ্ছি যে বাংলাটা 'ঠিকভাবে না জানলেও চলবে'। ভাষার এই অবজ্ঞার সাথে যুক্ত হয়েছে পোশাকি সংস্কৃতির দৈন্যতা, যেখানে উৎসব-পার্বণেও দেশি তাঁত বা জামদানির চেয়ে ভিনদেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর আকাশচুম্বী চাহিদা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে; পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ৫ বছরে বাংলাদেশে বিদেশি তৈরি পোশাকের বাজার ২৫% বৃদ্ধি পাওয়াই এর প্রমাণ। এর পাশাপাশি থ্যাঙ্কসগিভিং, হ্যালোইন বা ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র মতো আমদানিকৃত উৎসব নিয়ে যে তীব্র মাতামাতি দেখা যায়, তার সিকিভাগ আবেদনও আমাদের শেকড়ের উৎসব ‘নবান্ন’ বা ‘পৌষ সংক্রান্তি’র মাঝে অবশিষ্ট নেই। মূলত এই অন্ধ অনুকরণ ও সাংস্কৃতিক পরনির্ভরশীলতা আমাদের নিজস্ব জাতীয় চেতনাকে অবশ করে দিচ্ছে, যা আমাদের শেকড় থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন এক জাতিতে পরিণত করছে।
তথ্য ও পরিসংখ্যানের আয়নায় সাংস্কৃতিক অবক্ষয়: সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্যের নিবিড় বিশ্লেষণ আমাদের জাতীয় পরিচয়হীনতার এক করুণ ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে, যেখানে নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে পরনির্ভরশীলতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে মাত্র ৪০% শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে বা পড়তে সক্ষম, অথচ তাদের প্রায় ৯০% ভিনদেশি পপ সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে পরিচিত। এই ভাষাগত দৈন্যের পাশাপাশি বিপণন ও বিজ্ঞাপনের জগতেও হীনম্মন্যতা স্পষ্ট; বর্তমানে বাংলাদেশের টেলিভিশন ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের প্রায় ৬০% ই ভিনদেশি সংস্কৃতির আদলে নির্মিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে প্রায় ৪২% শিক্ষিত অভিভাবক মনে করেন যে সন্তান বাংলা সাহিত্য বা সংস্কৃতি চর্চা করলে তা তাকে কর্মজীবনে পিছিয়ে দেবে। এই সম্মিলিত অবজ্ঞা ও শেকড়বিমুখতা আমাদের নিজস্ব জাতিসত্তার ভিত্তিকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে।
এক শেকড়হীন প্রজন্মের উত্থান: একটি গাছ যেমন তার শেকড় ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি একটি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতি ছাড়া পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে পারে না। আমরা যখন অন্যকে অন্ধভাবে অনুকরণ করি, তখন আমরা স্রেফ ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন’ হিসেবে পরিগণিত হই। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা যদি আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে না পারি, তবে বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ যেখানে মানুষ থাকবে কিন্তু ‘বাঙালি’ সত্তা থাকবে না। ভবিষ্যৎ আমাদের এই চরম বার্তা দিচ্ছে যে—সাংস্কৃতিক দাসত্ব রাজনৈতিক দাসত্বের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। এটি মানুষকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেয়।
বীরদের ত্যাগ বনাম আমাদের বিচ্যুতি: আমরা কি একবারও ভেবেছি শহীদ আবু সাঈদ বা ওসমান হাদীর মতো বীরেরা কেন প্রাণ দিয়েছিলেন? তাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের জন্য। আমাদের ভাষা শহীদরা রক্ত দিয়েছিলেন মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য। আজ যখন আমরা নিজের ভাষা বলতে লজ্জা পাই, তখন কি তাঁদের সেই মহান ত্যাগকে উপহাস করা হয় না? আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি আমাদের পূর্বপুরুষদের লড়াইয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নিজের সংস্কৃতিকে ছোট মনে করা মানে হলো নিজের পূর্বপুরুষদের অপমান করা।
একটি বিয়ের আয়োজন ও বিদেশি ভাষার আস্ফালন: গত সপ্তাহে ঢাকার এক দামী ক্লাবে একটি বিয়ের কার্ড হাতে এলো। পুরো কার্ডটি ইংরেজিতে লেখা, এমনকি বিয়ের রীতিনীতিগুলোও বিদেশি এক ছাঁচে সাজানো। সেখানে বাজছে ভিনদেশি গান, অতিথিরা কথা বলছেন কৃত্রিম উচ্চারণে। সেখানে একজন বৃদ্ধ দম্পতি এক কোণায় বসে হাহাকার করছিলেন। তারা বললেন, "আমাদের সময়ে বিয়ে মানে ছিল গীত গাওয়া, আলপনা দেওয়া আর মাটির গন্ধ। এখন সব কেমন যান্ত্রিক আর ধার করা।" এই হাহাকারই হলো আমাদের বর্তমান সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আমরা জৌলুস বাড়িয়েছি কিন্তু প্রাণ হারিয়েছি।
শৃঙ্খল ভেঙে শেকড়ের টানে: পরিশেষে বলা যায়, অন্য দেশের ভালো জিনিস শেখা দোষের কিছু নয়, কিন্তু নিজের ঘর জ্বালিয়ে অন্যের আলোয় আলোকিত হওয়াটা মূর্খতা। আমাদের পরিচয় আমাদের ভাষায়, আমাদের পোশাকে এবং আমাদের ঐতিহ্যে। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিজ্ঞা করা উচিত—আমরা আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করতে শিখব। পাঞ্জাবি বা শাড়ি পরা মানেই অনাধুনিকতা নয়, বরং এটিই আমাদের আভিজাত্য। আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের শেখাই যে—পৃথিবীর সব ভাষা শেখো, কিন্তু নিজের ভাষাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো। অন্ধ অনুকরণের শৃঙ্খল ভেঙে আমরা আবার ফিরে যাই আমাদের শেকড়ে। কারণ, যে জাতি নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান দিতে জানে না, পৃথিবী তাকে কখনো সম্মান দেয় না।
লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান
মাস্টার্স (অর্থনীতি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
