ঢাকা
১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৫:০৬
logo
প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৫

ভোট উৎসবের বদলে নীরবতা: ডাকসুর নির্বাচন যেন না হয় প্রহসন

একটা সময় ছিল যখন পাড়ার ছোট্ট চায়ের দোকানেও ডাকসুর আলোচনা ঝড় তুলতো। আমাদের বাড়ির পাশের চা বিক্রেতা রহিম চাচার কথা বেশ মনে পড়ে। তিনি সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের নিয়ে নানা গল্প শোনাতেন। তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত স্বপ্ন আর উত্তেজনা ফুটে উঠতো। রহিম চাচার ছেলে রিয়াজ, যে এইবার ঢাবিতে ভর্তি হয়েছে, তার দিকে তাকিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, “রিয়াজ, তুই কিন্তু ডাকসুতে লড়বি! ছাত্রসমাজের জন্য কিছু করবি।” সেই সময়, ডাকসু নির্বাচন মানে শুধু একটি নির্বাচন ছিল না, বরং তা ছিল দেশের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, তারুণ্যের এক নতুন জাগরণের পূর্বাভাস। কিন্তু আজ, যখন ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হলো না, তখন রহিম চাচার সেই স্বপ্নভরা চোখ দুটো কেমন যেন বিষণ্ণ লাগে।

২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে পুরো দেশবাসীর মনে এক নতুন আশা জেগেছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এইবার বুঝি আমরা একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের রূপরেখা দেখতে পাবো। কিন্তু সেই স্বপ্নটা যেন অচিরেই ফিকে হয়ে গেল। কেন যেন এই নির্বাচন আর দশটা গতানুগতিক নির্বাচনের মতোই মনে হলো। প্রার্থীরা নিজেদেরকে জনগণের মাঝে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলেন না, আর ভোটাররাও যেন কোনো উৎসাহ খুঁজে পেলেন না।

প্রশ্ন জাগে, কেন এমনটা হলো? কেন দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারলো না? কেন তারা বিশ্বকে দেখাতে পারলো না যে, কীভাবে একটি ফ্যাসিস্টবিহীন সরকারের আমলে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে? আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে তারা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারতো। যেমন, প্রার্থীরা চাইলে নির্বাচনের আগেই তাদের উন্নয়নমূলক কাজের ৭০% সম্পন্ন করে ফেলতে পারতেন। ধরুন, তারা ক্যাম্পাসের ভেতরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়নে কাজ শুরু করে দিতেন। এতে ভোটাররা নির্বাচনের আগেই তাদের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারতো। এমন একটি দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারলে হয়তো অন্যান্য দেশও একে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতো।

এই ব্যর্থতার প্রভাব কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো দেশের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। যখন ছাত্রসমাজ তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়, তখন তারুণ্যের মাঝে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেয়। এই হতাশা থেকেই একসময় তারা রাজনৈতিক উদাসীনতার শিকার হয়। আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে, তারা যদি দেখেশুনে এমন হতাশাজনক নির্বাচন দেখে, তাহলে তাদের মনে নির্বাচন ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা জন্ম নেবে।

এই হতাশার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়েছে। শুধু ছাত্রসমাজই নয়, এমনকি সাধারণ মানুষও এর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। আমাদের পাশের বাড়ির ছোট্ট মন্টি, যে সবেমাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছে, সেও এখন তার বাবা-মায়ের মুখে হতাশাজনক রাজনৈতিক আলোচনা শোনে। সে বুঝতে পারে না কেন একটি নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এত নিস্তেজ এবং প্রাণহীন হয়। এই শিশুরাই তো একদিন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু তাদের মনে যদি ছোটবেলা থেকেই গণতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়, তাহলে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা কীভাবে সম্ভব? এই ব্যর্থতা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো জাতির এক বিশাল ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে।

আমাদের দেশের প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। হয়তো কোনো ভাই, বোন বা কাজিন সেখানে পড়াশোনা করছে। তারা যখন এই নির্বাচনকে ঘিরে কোনো উদ্দীপনা দেখতে পায় না, তখন তারাও হতাশ হয়ে যায়। কারণ তারা ভেবেছিল, এই নির্বাচন দেশের তরুণ সমাজকে এক নতুন পথ দেখাবে। এটি হতে পারতো সাধারণ স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য নির্বাচনের প্রথম পাঠ। তারা শিখতো কীভাবে আদর্শিক নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হয় এবং কীভাবে একজন প্রতিনিধিকে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য চাপ দিতে হয়।

এই নির্বাচন এমন একটি মাধ্যম হতে পারতো, যেখানে প্রার্থীরা নিজেদেরকে শুধু নেতা হিসেবে নয়, বরং সেবক হিসেবে প্রমাণ করতেন। তারা নির্বাচনের আগেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এবং সমস্যা সমাধানের একটি নতুন উদাহরণ তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এটি আবারও গতানুগতিক নির্বাচনগুলোর মতো দলীয় রাজনীতির ফাঁদে আটকা পড়ে গেল। এর ফলে দেশের জনগণ সেই অসাধারণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো, যা আমাদের জাতীয় নির্বাচনের একটি সুন্দর রূপরেখা তৈরি করতে পারতো।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, এই হতাশা সাময়িক। এই পরিস্থিতি থেকে আমরা শিখতে পারি যে, শুধুমাত্র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই হবে না, বরং তা হতে হবে প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক। আমাদের উচিত একটি নতুন রোডম্যাপ তৈরি করা, যা শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বরং সারাবছরই কাজ করবে।

ভবিষ্যতে এমন ঘটনা মোকাবেলা করার জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনগুলোকেও আরও সচেতন হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে, তারা শুধু একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, বরং পুরো ছাত্রসমাজের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে ধারণ করছেন। তাদের উচিত নির্বাচনের আগেই নিজেদের প্রতিশ্রুতিগুলোকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা।

এই ব্যর্থতা আমাদের জন্য একটি সুযোগও হতে পারে। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পরিবর্তন কেবল উপর থেকে আসে না, বরং তা শুরু হয় তৃণমূল থেকে। আমাদের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন, আমরা একটি নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি, যেখানে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা হবে আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এক সাহসী পদক্ষেপ। “আমাদের এই ব্যর্থতা হোক এক নতুন যুদ্ধের সূচনা, হতাশা ভেঙে গড়ব এক নতুন দিনের অনুপ্রেরণা।”

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram