ঢাকা
১৩ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৮:২০
logo
প্রকাশিত : জুলাই ২৮, ২০২৫

লো-লাইট স্টাডি: অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে গ্রামীণ শিক্ষা

মেহেরা গ্রামের ছোট্ট কুঁড়েঘরে কেবল এক মোমবাতি জ্বলছে, যার ম্লান আলোয় তার অক্ষরগুলো নীড়বিহীন হয়ে খুঁজে বেড়ায়। চোখের ঝাপসা ও মাথার ভার কাটিয়ে ঘুম ভাঙা যেমন ক্লান্তিকর, এই অভিজ্ঞতাও ঠিক তেমনি যা আহমেদ এবং আলম ২০১৯ সালে ব্যাখ্যা করেন। ২০২২ সালে ইসলাম তার গবেষণাপথে বলেন যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ শহরাঞ্চলে এই ‘লো লাইট স্টাডি’ বিরূপ ফল ডেকে আনছে; শিক্ষার্থীরা সূক্ষ্ম রেখাপাতের গভীরতা ধরে পড়তে পারে না আর আত্মবিশ্বাস ক্ষীণ হয়। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লক্ষ্য করে যে, শহরের স্লাম গলিতে ছোট্ট সাইরা টর্চলাইট হাতে আলো খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু ম্লান আলো তার প্রবল আকাঙ্ক্ষার তৃষ্ণা মেটাতে ব্যর্থ হয়। বর্ষার ঝনঝন শব্দে বাতি ম্লান হলে মনে হয় পড়াশোনা নয়, নিজের ভবিষ্যৎই হারিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ি ও স্লাম এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এক বিলাসিতা, যার অধিকার কেবল ধনী পরিবারের কাছে সীমাবদ্ধ। ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের এক জরিপে খেয়াল করে যে, বিকেলের পর কয়েল মাশাল বা অস্থায়ী ডিস্কো লাইটে পড়াশোনা হয়, কিন্তু অল্প আলোই চোখে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং মনোযোগ বাড়তে দেয় না। এই দৃশ্য প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু আর্থিক নয়, শিক্ষাগত অসমতাও পুষ্ট করে যা ২০২২ সালে ইসলাম লক্ষ্য করেন। ফলে শিশুরা অপ্রতুল প্রশিক্ষণে আটকা পড়ে, মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক অগ্রগতিতে বিপর্যয় ডেকে আনে। কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘অন্ধকার’ কবিতায় খুব সুন্দর ভাবে কিছু পঙ্গতির মাধ্যমে ফুটে উঠেছে,

“ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম – পদ্মের রাতে –
কোনদিন আর জাগবো না জেনে
কোনদিন জাগবো না আমি – কোনদিন জাগবো না আর –
হে নীল কন্তুরী আকাশের চাঁদ,
তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্পন্দন নও,
হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে,
রয়েছে সে অজস্র ঘুম”

২০২০ সালে চৌধুরী তার জার্নালে বলেছেন যে, অল্প আলোতে পড়াশোনা শুরুতেই চোখের লেন্সে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ছানি তৈরি করে ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস করে। পড়াশোনায় শিশুরা ঝাপসা দেখা, মাথা ব্যথা ও চোখে জ্বালাপোড়া অনুভব করে। ২০২১ সালে হোসেন, রহমান এবং কারিম তাদের গবেষণায় ফুটিয়ে তুলেন অপরদিকে, মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তথ্য প্রক্রিয়াকরণ থেমে যায়, যা মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয়। সরকারি মডেল স্কুলের শিক্ষার্থী তিউনার উদাহরণ প্রমাণ করে, সন্ধ্যার অস্থিতিশীল আলোতে পড়াশোনা গড় ফলাফল ১৫% কমিয়ে দেয়। এই শিক্ষাগত ফাঁক, যা মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষয় করে।

২০২১ সালে হোসেন, রহমান এবং করিম আরো বলেন যে, যদি আমরা অল্প আলোয় পড়াশোনার সংকট সমাধান না করি, আগামী দশকে শিক্ষার মান ২৫% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ফেলবে। ফলস্বরূপ, কর্মপরিষদে প্রবেশাধিকার সীমিত হবে, উৎপাদনশীলতা কমে যাবে এবং জাতীয় জিডিপি বৃদ্ধিতে ৩%-৫% ক্ষতি হবে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে এবং সামাজিক সুরক্ষামূলক খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এভাবে অল্প আলোতে পড়াশোনা জাতির অগ্রগতির গতিকে স্থবির করে দেবে।

২০০৩ সালে ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের ‘গ্রামীণ শক্তি’ (Grameen Shakti) উদ্যোগে গ্রামীণ এলাকায় সৌরশক্তি নির্ভর হোম সিস্টেম প্রদান করা হয়, যাতে রাতের অন্ধকারে সুষ্ঠু আলো জ্বলে। এর ফলে পড়ার পরিবেশ সুগম হয়েছে, চোখে চাপ কমেছে এবং মনোযোগ স্থায়ী হয়েছে। তিনি ‘সোলার স্টাডি ল্যাম্প’ ও ‘গ্রামীণ স্টাডি কর্নার’ প্রকল্প চালু করেছেন, যা শতাধিক গ্রামে গড় ফলাফল ২০% বৃদ্ধি করেছে। এই উদ্ভাবনী মডেল প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ মিলিয়ে অল্প আলোতে পড়াশোনার সমস্যা সমাধান সম্ভব।

অল্প আলোতে পড়াশোনার দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সমাধানে প্রয়োজন সরকারি নীতি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সামাজিক অংশীদারিত্ব; যেমন সোলার আলো বিতরণ, বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় ‘লাইটিং কমিটি’ গঠন। কমিউনিটি স্টাডি লাউঞ্জ ও স্টাডি লাইট স্কিম বাস্তবায়ন করলে আমরা প্রতিটি শিশুকে সমান সুযোগ দিতে পারব, চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করব এবং শেখার আগ্রহ উজ্জীবিত করব। হ্যাঁ, সঠিক পদক্ষেপে অন্ধকার কাটিয়ে আলোর স্বপ্ন পূরণ সম্ভব। “আলোর প্রতিটি খণ্ডেই লুকিয়ে আছে একটি নতুন আশা।”

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram