

বাংলার চিন্তাকাশে আহমদ ছফার নাম এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা, যার আলো শুধু পথই দেখায় না, চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় সমাজের অন্তঃসারশূন্যতা ও ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বজিজ্ঞাসার গভীর গহ্বর। তিনি ছিলেন এক সৃষ্টিশীল বৈপরীত্য—জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় নিষ্পেষিত অথচ মনের আকাশে অনন্তের সন্ধানী; ঘন নিঃসঙ্গতায় আচ্ছন্ন তবু যার কলমে ধ্বনিত হতো সমগ্র জাতির অব্যক্ত বেদনা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের এক অনাড়ম্বর পরিবারে তার জন্ম যেন এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের সূচনা, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, আর মননের মুক্তি ছিল একমাত্র অবলম্বন।
ছফার জীবনের নিগূঢ়তম বেদনা শামীম শিকদারের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্কের জালে বোনা। এই প্রেম শুধু হৃদয়ের টানাপোড়েন ছিলো না, বরং ছিলো এক দার্শনিক অভিজ্ঞতা—যেখানে মিলন ও বিচ্ছেদের দ্বন্দ্ব রূপান্তরিত হয়েছিল সৃষ্টিশীলতার শক্তিতে। শামীমের সঙ্গে তার সম্পর্কের জটিলতা, মোহ-মুক্তি ও মর্মান্তিক দূরত্ব গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে তার সাহিত্যের শিরায়-উপশিরায়। 'অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী' কিংবা 'ওঙ্কার'-এর নারীচরিত্রগুলির অন্তর্গত যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মানুসন্ধানে শামীমের প্রতিচ্ছবি অনুমান করা যায়। এই প্রেম-বিরহের দাহ তাকে একাকীত্বের শিল্পীতে পরিণত করেছিল, যার সুর বেজে উঠেছে প্রতিটি গ্রন্থের আত্মজৈবনিক স্তরে, প্রমাণ করে ব্যক্তিগত বেদনা কীভাবে বিশ্বজনীন শিল্পে রূপান্তরিত হয়।
ছফার রচনাবলি বাংলা সাহিত্যে এক যুগসন্ধির সাক্ষ্য। 'অলাতচক্র' কেবল উপন্যাস নয়—এক আত্মজৈবনিক আখ্যান, যেখানে বুদ্ধিজীবীদের আত্মপ্রবঞ্চনা ও সমাজের নৈরাজ্যের চিত্র এঁকেছেন তিনি নির্মম সত্যনিষ্ঠায়। 'যদ্যপি আমার গুরু' শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তিমূলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, জ্ঞানের আদান-প্রদানকে তুলে ধরে এক গুরু-শিষ্যের আধ্যাত্মিক যাত্রারূপে। 'বাঙালি মুসলমানের মন' প্রবন্ধগ্রন্থটি জাতীয় চেতনার এক মৌলিক পাঠ—যেখানে তিনি উন্মোচন করেছেন পরিচয়ের সংকট ও ইতিহাসবিমুখতার বিষময় ফল। অন্যদিকে 'গাভী বৃত্তান্ত' তার সাহিত্যিক প্রতিভার সবচেয়ে দুরন্ত প্রকাশ, যেখানে এক গাভীর রূপকথার আড়ালে তিনি বিদ্ধ করেছেন সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে। এই উপন্যাসের শ্লেষ এতই তীক্ষ্ণ যে, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়কে চিরন্তন করে তোলে। 'পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ' প্রকৃতির রূপকে মানবসভ্যতার উত্থান-পতনের মহাকাব্যিক বয়ান রচনা করে, আর 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' গ্রন্থটি তার দার্শনিক চিন্তার শীর্ষবিন্দু—যেখানে পূর্ববাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের গভীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি তিনি অঙ্কিত করেন এক নতুন মননভূমির রূপরেখা।
ছফার চিন্তাজগৎ ছিল একাকীত্বের সাধনায় লালিত। তার নিঃসঙ্গতা কখনো দুর্বলতা নয়—বরং এক দার্শনিক অবস্থান, যেখানে ব্যক্তি সমাজের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে সত্যের সন্ধানে নিবিষ্ট হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, "চিন্তাশীল মানুষকে একা হতেই হয়"—কারণ সৃষ্টির শক্তি জন্ম নেয় নির্জনতার গর্ভে। এই একাকীত্বই তাকে দিয়েছিল সমাজের পচন, রাজনীতির ভণ্ডামি এবং বুদ্ধিজীবীদের আত্মপ্রবঞ্চনা দেখার নির্মোহ দৃষ্টি। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা—যেখানে শিক্ষা হবে শেকলের বদলে ডানা, আর শিল্প হবে মানুষের অন্তর্গত আলোর সন্ধানী। তিনি ছিলেন ভাষার এক সন্ন্যাসী, যার জন্য লেখা ছিল ধ্যান, সত্য ছিল সাধনা, আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল ব্রত।
২০০১ সালের ২৮ জুলাই, শ্রাবণের করুণ বৃষ্টিধারার মধ্যে ছফা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। তার প্রয়াণ ছিল বাংলার চিন্তাজগতে এক মহীরুহের পতন। কিন্তু মৃত্যু কি তাকে স্পর্শ করতে পেরেছে? আজও তার 'অলাতচক্র' আমাদের আত্মসমালোচনায় বাধ্য করে, 'গাভী বৃত্তান্ত' রাজনীতির মুখোশ খুলে দেয়, 'বাঙালি মুসলমানের মন' জাতিসত্তার দোলাচলে ভারসাম্য দাবি করে। তার গ্রন্থগুলো আজও জ্বলজ্বল করে—প্রতিটি পাতা যেন অগ্নিময় উচ্চারণে বলে: "লেখককে সর্বপ্রথম সৎ হতে হয়।"
এই শ্রাবণে, তার প্রয়াণবার্ষিকীতে, বাংলার ভেজা মাটি স্মরণ করিয়ে দেয়—এই ভূমিই জন্ম দিয়েছিল এক অকুতোভয় চিন্তাবিদকে। ছফা শুধু লেখক নন, তিনি আমাদের যুগের বিবেক, বিদ্রোহের প্রতীক-যার মশাল আজও প্রজ্বলিত আছে তরুণ প্রজন্মের হাতে। তার জীবন আমাদের শেখায়: সত্য কখনো সুবিধার বশবর্তী হয় না, নিঃসঙ্গতা কখনো পরাজয় নয়, আর মৃত্যুই চূড়ান্ত বিদায় নয়—যে চিন্তা মানুষের হৃদয়ে জন্ম নেয়, সে চিরকালের। তার প্রস্থান আমাদের ফেলে গেছে এক প্রশ্নের মুখোমুখি: আমরা কি তৈরি সেই দায়বদ্ধ আত্মজিজ্ঞাসার জন্য, যার ডাক তিনি দিয়েছিলেন সমস্ত জীবন?
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বাংলার এই অমর কথাশিল্পীকে, যার নির্জন মশালের আলোয় আজও আমরা খুঁজি আমাদের হারানো আত্মপরিচয়ের পথ।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

