

এমন একটি সমাজ কল্পনা করুন যেখানে প্রতিটি শিশু তার ভবিষ্যতের দিকে একদম রোবটের মতো, নিষ্প্রাণভাবে চলেছে। প্রতিদিন সকালে স্কুলের পথে, তাদের চোখে দেখা যায় এক ধরনের শূন্যতা, যেন তারা সৃজনশীলতা, কল্পনা, বা স্বাধীন চিন্তাভাবনার সাথে বড় হচ্ছে না। তাদের জন্য শিক্ষা, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য একটি উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন তারা কোনও রোবট হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে, আজকাল আমরা এমনই একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যেখানে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা সংস্কৃতি এমনভাবে ছাত্রদের মস্তিষ্কে বদ্ধ হয়ে যাচ্ছে যে, তাদের চিন্তার পরিসর সীমিত হয়ে পড়ছে। এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের একটি গভীর সংকটের সূচনা। এই প্রজন্মের জন্য শিক্ষা কখনোই তাদের চিন্তা, সৃজনশীলতা, বা জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার পথ নয়, বরং এক ধরনের যন্ত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোথায় গেল কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্যার্থীরা, যা তিনি “বিদ্যাডুবি কবিতায় ব্যক্ত করেছেন:
“বিদ্যাডুবি, বিদ্যাডুবি, জ্বালিয়াছো যে দীপ,
বীণা বেজাইয়াছো যে সুর, তব অমৃতর রূপ!
মোর হিয়া প্রজ্বলিছে হেমন্তের রাত্রি চিরন্তন,
স্নেহ মাখা তোমার বাণী, জ্ঞানের দ্যুতি অমর।”
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার শিকড় আজ মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা সংস্কৃতির মধ্যে অবস্থিত। শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তারা জানে না, তাদের অর্জিত জ্ঞান আসল জীবনে কতটুকু প্রাসঙ্গিক। কোচিং সেন্টারগুলোর ব্যাপক বিস্তার এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। কোচিংগুলো মূলত পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে, কিন্তু তা কখনোই তাদের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান দিতে সক্ষম নয়।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, একজন ছাত্র যিনি কোচিংয়ে ভালোভাবে প্রস্তুত হলেও, কর্মস্থলে তার কাজের জন্য কোনো গভীর চিন্তা বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা খুঁজে পান না। কোচিংয়ের জন্য তারা যা শেখে, তা মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যেখানে জীবনের প্রকৃত সমস্যা নিয়ে আলোচনা বা চিন্তা-ভাবনার জায়গা নেই। ২০২১ সালে রহমান তার জরিপের মাধ্যমে বলেন যে এভাবে, এই সমস্যা বাংলাদেশের সমাজের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলছে। শিক্ষার্থীরা জানে না কিভাবে নিজেদের চিন্তা এবং সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে হয়।
যদি এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে দেশের যুব সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। যে জাতি চিন্তা-ভাবনা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনের প্রতি গুরুত্ব দেয় না, সে জাতি কখনোই প্রগতি লাভ করতে পারে না। আমরা জানি যে, উন্নত দেশগুলো তাদের তরুণদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে তাদের অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এই সমস্যার ভবিষ্যত প্রভাব বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরে পড়বে। প্রতিটি খাতে, যেমন শিল্প, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি—সবখানেই দক্ষতার অভাব দেখা দেবে। যদি আমরা এই অন্ধকার পথ থেকে বেরিয়ে না আসি, তবে আমাদের যুব সমাজের ক্ষমতা কখনোই আসল পথে প্রবাহিত হবে না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগগুলো আমাদের জন্য এক আলোর পথ। তিনি গ্রীণ গ্র্যাম প্রোগ্রামের মাধ্যমে সৃজনশীলতার মঞ্চ তৈরি করেছেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের উপর নির্ভর না থেকে, তাদের দক্ষতা এবং চিন্তা শক্তি ব্যবহার করতে পারে। তার মতে, শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ জ্ঞানের পাশাপাশি জীবনের বাস্তবতা শেখাতে হবে। ডঃ ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা এবং শিক্ষার মাধ্যমে তিনি নতুন ধরনের চিন্তা এবং উদ্ভাবনের উদাহরণ রেখেছেন, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারে। তার এই উদ্যোগগুলো সমাজের উন্নতির পথ সুগম করতে পারে, এবং দেশের তরুণদেরকে জীবনের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সাহায্য করবে।
যতই কঠিন হোক না কেন, এই সমস্যা সমাধান সম্ভব। আমরা যদি সঠিক পদক্ষেপ নিই, তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন সম্ভব এবং এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যতের পথ খুলে দিবে। ড. ইউনূসের মতো চিন্তাবিদরা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এবং আমরা যদি তাদের দেখানো পথে এগিয়ে যাই, তবে আমাদের দেশ উন্নতির পথে হাঁটবে। "আমাদের শিক্ষাকে সৃজনশীলতার দিকে মোড় নিতে হবে, যাতে আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারি।"
লেখক:
১. ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্রাক ইউনিভার্সিটি
২. দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্রাক ইউনিভার্সিটি

