

ইট-পাথরের নগরী ও যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি আর অফিসের ক্লান্তি ভুলে একটু প্রশান্তি খুঁজতে গেলে দূরে কোথাও বেড়িয়ে আসা অনেক সময়ই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তেমনই এক সময়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম বাংলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ইতিহাস, প্রকৃতি, সীমান্তঘেঁষা জনপদ আর আমের রাজ্য হিসেবে খ্যাত এই জেলার ভেতরে ছিল অজস্র চমক।
ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য সুখবর দিতে চাই যে, ব্যস্ত শহরের কোলাহল পেরিয়ে যারা প্রকৃতির ছোঁয়ায় একটু প্রশান্তি খোঁজেন, তাদের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন জনপদ এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। সেজন্য বলা চলে এ ভ্রমণ শুধু স্থানপরিক্রমা নয়, বরং আত্মার সঙ্গে প্রকৃতির বন্ধনের এক অন্তর্দৃষ্টি।
তাই ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডারে ৩ থেকে ৫ জুলাই লেখা থাকলেও, এ ভ্রমণ কাহিনি যেন নিয়ে গেল আরও পুরোনো এক সময়ে—যেখানে ছিল আরো নির্ভেজাল আনন্দ, নিঃশর্ত বন্ধুত্ব, বিনিময়হীন অসাধারণ আপ্যায়ন আর স্মৃতিতে গেঁথে থাকার মতো অভিজ্ঞতা। অফিস শেষে সেদিন ভ্রমণ পিপাসু যাত্রীর মধ্যে পাঁচজন কমলাপুর থেকে, বাকিরা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম। উল্লেখ্য যে, তিনদিন ছুটি থাকার কারণে এক বগিতে পাশাপাশি নয়টি ট্রেনের টিকিট ম্যানেজ করা কঠিন ছিল। তাই সিটগুলো তিন বগিতে পাওয়ায় বসতে হয়েছে নিজেদের মধ্যে একটু সেক্রিফাইস করে। এজন্য শুরুতে কিছুটা ছন্দপতন মনে হয়। তবে সামগ্রিকভাবে এটি কেবল একটি ট্যুর ছিলনা, বরং হৃদয়ের গভীরে একই আত্মার টান—আম ও কলা চাষ বাগান, সীমান্তবর্তী মানুষ, কৃষকের মাথায় বাঁশের মাথাল, ইতিহাস, প্রকৃতি সহযাত্রার মেলবন্ধনে গড়া এক জীবন্ত কাব্য।
সফর সঙ্গীদের সম্পর্কে গোপন রাখতে চেয়েও গোপন করতে পারিনি! বিশেষ করে আমাদের সাথে ছিলেন ব্যাংক এশিয়ার দুর্দান্ত ও চৌকস সহকর্মী: সর্ব জনাব, শ্রদ্ধেয় এ,কে,এম মুয়িদ খান, কামরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম সোহেল, সামিউল কায়সার, নাশিদ কোরাইশী, জসিম উদ্দিন, মোঃ ফারুক হোসেন, আমিরুল ইসলাম (যার বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জ) এবং আমি মিজানুর রহমান।
৩ জুলাই, রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন থেকে স্নিগ্ধা ট্রেন ছাড়ার সময় থাকলেও কিছুটা বিলম্বে ছাড়ল রাজশাহীর পথে। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ, অজগরের মত আঁকা-বাঁকা হয়ে চলা, জানালার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, শহর ও লোকালয়ের আলোর বাতির সাথে নাশিদ, জসিম ও ফারুকের নানাবিধ গল্প, কামরুল ভাই, সোহেল, মুয়িদ মহোদয়ের প্রাণখোলা কথোপকথন মিলে রাত্রিযাত্রা হয়ে উঠেছিল উচ্ছ্বাসময়। কারো হালকা ঘুম আবার কারো নির্ঘুম রাত পার হয়ে, কাক ডাকা ভোর ও ফজরের আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম শব্দ ভেসে আসতেই রাজশাহীতে পৌঁছে যাই। ছুটির দিন ও সকালে বৃষ্টি হওয়ায় ট্রেন থেকে নেমে নাস্তার জন্য প্রত্যাশিত হোটেল খুঁজে পাচ্ছিলাম না যা খানিকটা বিরম্বনা তৈরি করে। অবশেষে কাঙ্খিত নাস্তা শেষে বিনোদনের সেরা ঠিকানা পদ্মার পাড় ঘুরে হাইস গাড়িতে চাপাইনবাবগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
সীমান্ত শহরের ইতিহাস আর আমের রাজ্য হিসেবে খ্যাত এ অঞ্চল আমাদের কাছে ছিল প্রবল আগ্রহের বিষয়। এছাড়াও এখানে শিবগঞ্জের কানসার্ট জমিদার বাড়ি, সীমান্তবর্তী "সোনা মসজিদ স্থলবন্দর"। এ বন্দরটি সবসময় ব্যস্ত থাকলেও সেদিন শুক্রবার ও বর্তমান ভৌগলিক রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে বন্দরটি একদমই নীরব থাকতে দেখি। তবে স্থলবন্দরে গিয়ে নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে একদম কাছে যেতে ইচ্ছে হলেও বর্তমান ভারত ও বাংলাদেশের ভূ-সম্পর্ক, সীমারেখা ও নিরাপত্তা বিধির কারণে দূর থেকেই দেখতে হচ্ছিল। ঠিক তখনই সহকর্মী সামিউল কায়সার সাহেব তার নির্ভরযোগ্য স্বজন ও বিজিবির সহকারি পরিচালককে ফোনে অবহিত করলে দায়িত্বরত বিজিবির ক্যাম্প থেকে আমাদেরকে রিসিভ করে নিয়ে গেলেন সরাসরি জিরো পয়েন্টে। তখন আনন্দ বহুগুণে বেড়ে গেল এবং আরেকটি তৃপ্তির ঢেকুর স্মৃতির মনিকোটায় স্থান করে নিল। সেজন্য কৃতজ্ঞতা চিত্তে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি সেই বিজিবি'র সহকারি পরিচালক ও কর্মকর্তা- জনাব মোঃ ইয়াসিন হোসাইন সাহেব এবং সামিউল কায়সার সাহেব এর প্রতি। কেননা তাদের যৌথ আন্তরিকতায় এমন টি সম্ভব হয়েছিল।
এরপর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ। মোঘল স্থাপত্যের নিদর্শন এ মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন চলে যাই শতাব্দীর পেছনে—যেখানে সময় থেমে আছে, স্থাপত্য বলছে ইতিহাসের গল্প। আর মন ছুঁয়ে যাওয়া এক চিরন্তন অভিজ্ঞতা। এমন ভ্রমণের এক ফাকে জানতে পারি মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস বা তাদের পুরাকৃতি দেখতে পেলে সহকর্মী নাশিদ কোরাইশীর হৃদয়ে নতুন স্পন্দন তৈরি হয়। তবে কেন সেটা হয় তা অজানাই থেকে গেল। আর সেখানে ছবি তোলা, পুঙ্খানুরূপে মসজিদ পরিদর্শন, স্বল্প পরিসরে নফল নামাজ- প্রার্থনা ও যাত্রা বিরতি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল।
আমের মৌসুমে চাপাইনবাবগঞ্জে না এলে জীবনের একটা স্বাদ যেন অপূর্ণই থেকে যায়। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, আম বাগান আর আম বাগান। হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, বারি-৪, ফজলি—ইত্যাদি প্রতিটি জাতের আম যেন একেকটি নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এরই সাথে আম ফাউন্ডেশন ও গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে আমরা শুধু আমচাষ নয়, এর উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। তাই আমাদের সফর যেন হয়ে উঠল এক গবেষণাভিত্তিক ভ্রমণ।
এরপর যাত্রা রহনপুরে। সেখানে পৌঁছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে যাই অজপাড়া সবুজ গ্রামে। সেখানে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে পটল পাতার তৈরি বড়া ও চা খেয়ে মুগ্ধ হই। তারই সাথে মায়াময় সবুজ গ্রাম দেখে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার সন্নিকটে রহনপুর ও রাধানগর ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি "রামদাস" বিল ভ্রমণ করি।
নিরব বিলের প্রকৃতির ক্যানভাস দেখে মন ভরে যায় অবলীলায়। এ গহীন বিলেই আমরা আয়োজন করি আনন্দঘন বারবিকিউ পার্টি। রামদাসের বিলের বাতাস, গ্রিল হওয়া মাংসের গন্ধ, গানের তালে সোহেল সাহেব ও নাশিদের বিনোদন দেয়ার যৌথ নৃত্য —সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন নস্টালজিকা।
তবে সকলের মুখে আফসোস শুনতে পাই! বিশেষ করে কামরুল ভাইয়ের মুখে বার বার উঠে আসে, সন্ধ্যার পূর্বে সেখানে গেলে আরো অন্যরকম লাগতো! অবশেষে উৎসব পরবর্তী রাত্রিবেলায় রহনপুরে ডাক বাংলোতে স্বল্প বিছানায় ঘুমিয়ে পড়া এবং পরদিন সকালে পুনর্ভবা নদীর ঠান্ডা পানিতে স্নান করে শরীর-মন সতেজ হয়ে ওঠা যা শহুরের কিছুটা ক্লান্তি যেন ধুয়ে মুছে যায়।
সকালবেলা আমরা ঘুরেছি জেলার পাইকারি আম বাজার। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত বিক্রেতা ও ক্রেতার উপস্থিতিতে এ যেন এক উৎসবের চিত্র। এখানে আমরা শুধু বাজার দেখিনি। কেউ কেউ আম কিনেছেন নিজস্ব খাওয়ার জন্য, কেউ উপহারের জন্য। দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়াতে সখের বসত আমি আর ফারুক কিছু আম সংগ্রহ করি। তবে দাম কম হলেও মান ছিল চমৎকার। তাই এখানেই বোঝা গেল—এ অঞ্চলের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন কীভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
আমরা গিয়েছিলাম ভোলারহাট উপজেলায়—একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম। এখানকার মানুষের সরল হাসি, চা-পানের আমন্ত্রণ, অসাধারণ ডাব খাওয়া, গল্পে গল্পে জীবনবোধের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে মন ছুঁয়ে যাওয়া নতুন এক অধ্যায়। আর ছোট ছোট নদীর ওপারে দেখা যায় ভারত সীমান্ত, এখানে শুধু নামে মাত্র দুই দেশের সীমান্ত রেখা কিন্তু বাস্তবে এ জনপদ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের তীর্থস্থান!
ফেরার পথে রাজশাহী সদরে অবস্থিত "এজি প্লাস্টিক, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং" শিল্প ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে একটি প্রেরণাদায়ক পরিদর্শনের সুযোগ হয়। প্রতিটি ফ্লোর ঘুরে ঘুরে দেখার সময় আমরা প্রত্যক্ষ করি কীভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি শূন্য থেকে সফলতার চূড়ায় পৌঁছেছে। এই প্রতিষ্ঠানের পেছনের গল্পটিও ছিল অসাধারণ। ২০০৫ সাল থেকে এক তরুণ উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রম, স্বপ্ন আর অধ্যবসায়ে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠান আজ রাজশাহী অঞ্চলের পরিচিত শিল্প-প্রতিষ্ঠান। বর্তমান সময়ে এটি শুধু একটি কারখানা নয়, বরং স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে সক্রিয় অবদান রাখার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পরিদর্শনকালে আমাদের সাথে ছিলেন কোম্পানির চেয়ারম্যান, জনাব মোঃ আব্দুল গনি সাহেব—কায়সার ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে রাজশাহীর বিখ্যাত খাঁটি দই ও মিষ্টি আপ্যায়ন ভ্রমণকে করে তোলে আরও স্মরণীয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও ব্যবসায়িক কৌশল—সব কিছুতেই দেখা গেছে এক গভীর পরিকল্পনা ও পেশাদারিত্বের ছাপ। আমরা সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন কৌশল ও গতিশীলতা দেখে। শুভকামনা জানাই—এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরও প্রসারিত হোক, ছড়িয়ে পড়ুক স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় অঙ্গনে। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি হতে পারে এক অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
একটি বিষয় উল্লেখ যে, সফরের অন্যতম স্মরণীয় অংশ ছিল জনাব কায়সার সাহেবের নিরব প্রচেষ্টায় প্রতিটি স্পটে ঘনিষ্ঠদের রেফারেন্সে কখনো রসনা বিলাস, কখনো আনন্দদায়ক ইভেন্ট ও ভিন্ন কিছু অন্তর্ভুক্ত করা। তবে আমিরুল ভাইয়ের আম ও কলা বাগান ঘুরে কাঁচা সাগর কলা সংগ্রহ ছিল আনন্দের মাঝে টক, ঝাল অভিজ্ঞতা।
তবু ফেরার পরেও একবার চোখ বন্ধ করলেই যেন ভেসে ওঠে ট্রেনের শব্দ, স্থল বন্দর, সোনা মসজিদের স্তব্ধতা, আমের স্বাদ, দুই বাংলার সীমান্তের গল্প, সহকর্মী ফারুকের নানাবিধ নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা, জসিমের নিরব নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ জমিয়ে কথা বলা! কামরুল ভাইয়ের আচমকা গল্প, সোহেল সাহেব এর উচ্ছ্বসিত মিসাইল বিনোদন, গাড়ির ভিতরে স্বীকারোক্তি না দেয়া নিষিদ্ধ অক্সিজেন, নাসিদের নানাবিধ আনন্দের উপলব্ধি, আমিরুল ভাইয়ের প্রশ্নবোধক বিনোদন, রাতভর তাস খেলাসহ মুয়িদ মহোদয়ের সারাক্ষণ জমানো গল্প, পুনর্ভবার ঠান্ডা জলের ছোঁয়াসহ ইত্যাদি না বলা হাজারো রহস্য!
অবশেষে ৫ জুলাই রাত ৯:৩০ এ আমরা ঢাকা ফিরি আর অনুভব করি, ভ্রমণ কেবল স্থান পরিবর্তন নয়, এটি এক অনন্য মানসিক পরিশুদ্ধির অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়া তেমনি পেয়েছি হৃদয়ের গভীরে গড়ে ওঠা আন্তরিক পরিপক্ব রূপ। বিশেষত, মুয়িদ খান মহোদয়ের পচিশ বছরের গৌরবময় চাকরি জীবনের শেষ পর্বে তাঁর বিদায়ক্ষণে এ সফর যেন এক আবেগঘন বিদায়বেলা! তাছাড়াও এ ভ্রমণ আমাদের শিখিয়েছে—একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধুই কাঠামো বা নিয়ম নয়, বরং মানবিকতা, সৌহার্দ্য আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। সেই সূত্র ধরেই এ ভ্রমণ প্রাকৃতিক প্রেম ও সাংস্কৃতিক সংযোগের গল্প হিসেবে চিরভাষ্যর মোনালিসার ছবির মতো যুক্ত থাকবে প্রেরণা হয়ে নতুন ট্যুরের পরিকল্পনায়।
----ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

