

বিশ্বব্যাপী যখন তামাকবিরোধী লড়াই আরও জোরদার হচ্ছে, ঠিক তখন ইসিগইন্টেলিজেন্স-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদ বিকল্প পণ্যগুলোর উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ফলে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও থাইল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোতে অবৈধ বাজার বেড়ে চলেছে। এতে একদিকে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ভোক্তারা আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
এর তথ্য বিশ্বের অন্যতম কঠোর ই-সিগারেট নিষেধাজ্ঞা থাকা থাইল্যান্ডে, নিরাপদ বিকল্প পণ্যের অবৈধ বাজার দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। এক বছরে এক লাখের বেশি অবৈধ তামাকপণ্য জব্দ, জরিমানা ও সীমান্ত নজরদারি সত্ত্বেও, ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং রাস্তার পাশের দোকানগুলো সহজেই এসব পণ্য সরবরাহ করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একধরনের ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে। যেখানে একদিকে চোরাচালান চলছে, আর অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে, কিশোরদের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে ডিসপোজেবল ভেপ পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী দেশগুলো থেকে চোরাচালান শুরু হয়েছে, বিশেষ করে যেসব দেশে নিয়মকানুন তুলনামূলকভাবে শিথিল। শ্চর্যজনকভাবে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই দেখা গেছে, ফ্রান্সে কিশোরদের ব্যবহৃত প্রায় ২০ শতাংশ নিকোটিন পণ্যই ছিল অবৈধ।
উপরের দুই দেশের পরিস্থিতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ চাহিদা বন্ধ করে না বরং কারা লাভবান হচ্ছে, সেটাই পরিবর্তন করে। পাশাপাশি, অবৈধ বাজারের বিস্তার একদিকে অর্থনীতিতে ক্ষতি ডেকে আনে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
নিকোটিনযুক্ত পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি ভিন্ন রকম। যেমন, ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের প্রধান কারণ সিগারেট ও বিড়ির মতো তামাকজাত পণ্যগুলো, যেহেতু এগুলো পুড়লে বিপজ্জনক রাসায়নিক তৈরি হয়। তবে ভেপিং বা হিটেড টোব্যাকোর মতো বিকল্প পণ্যে এসব ঝুঁকি অনেক কম। যুক্তরাজ্যের পাবলিক হেলথ-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রিত ই-সিগারেট সাধারণ ধূমপানের তুলনায় প্রায় ৯৫% কম ক্ষতিকর। সে কারণেই যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ড ক্ষতি হ্রাসমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে নিকোটিন ও তামাক আলাদা, তবুও অনেক মানুষ এখনো এই দুটিকে এক মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্বে তামাক ব্যবহারের উচ্চহারের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, এবং এখানে পরিস্থিতি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের মতো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিকল্পগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার একটি প্রবণতা জোরালো হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই অবৈধ তামাক ব্যবসার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। যদি এসব নিরাপদ বিকল্পকে বৈধ বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আরেকটি নতুন অবৈধ বাজার গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হবে। যা নিয়ন্ত্রণ করা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে তামাকজাত পণ্যের ওপর আরোপিত কর থেকে। নিরাপদ বিকল্পগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলে অনেক ভোক্তা অবৈধ বাজারে চলে যেতে পারে, যার ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে, সরকার রাজস্ব হারাবে এবং মানুষ ধূমপান ছাড়ার জন্য কার্যকর বিকল্প থেকেও বঞ্চিত হবে। এ কারণেই পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পথে না গিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা, কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রি সীমিত রাখা, মোড়কের সঠিক তথ্য যাচাই, কর পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং ধূমপান বনাম নিরাপদ বিকল্পের পার্থক্য নিয়ে জনগণকে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া।
বাংলাদেশের তামাক নীতিতে দরকার বিচক্ষণতা, স্পষ্ট নিয়ম ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ। নিষেধাজ্ঞা ও বিভ্রান্তি নয়। নিকোটিন বিকল্পগুলো নিষিদ্ধ করলে ক্ষতি কমে না, বরং অবৈধ বাজারকে আরও উৎসাহিত করা হয়। বাংলাদেশ অন্য দেশের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে যা জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও দেশের অর্থনীতি দুইই রক্ষা করবে।

