

‘একই পাঠ্যক্রম, একই ক্লাসঘণ্টা ও সমপরিমাণ দায়িত্ব পালন করলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বিশাল ফারাক বিদ্যমান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে নামমাত্র বেতনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের টিকে থাকা যেন এক কঠিন সংগ্রাম। যা শিক্ষকদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অথচ, নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে এই বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত। দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধারদের গড়ে তোলার এই কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নের কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা চোখে পড়ে না, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। কেউ বোঝে না আমাদের কষ্ট। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ১ হাজার টাকা আর চিকিত্সা ভাতা ৫০০ টাকা, যা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পুরোপুরিই হাস্যকর একটা বিষয়। এই সামান্য অর্থ দিয়ে বর্তমান শহুরে জীবনে, এমনকি গ্রামীণ জনপদেও একটি মানসম্মত বাড়িভাড়া বা চিকিত্সার খরচ নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব। ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে একজন শিক্ষক যখন তার চাকরিজীবন শুরু করেন, সেই শিক্ষকের কাছে জাতি কী আশা করতে পারে?’
অনেকটা আক্ষেপ করে গতকাল এ কথাগুলো বলেন সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান। তার মতো অসন্তোষে রয়েছেন ৫ লাখ বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। তারা জাতীয়করণের দাবিতে আগামী ১৩ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সমাবেশ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। সমাবেশ সফল করতে দেশের প্রতিটি জেলা থেকে বাস রিজার্ভ করে শিক্ষকদের ঢাকায় আনার প্রস্তুতি চলছে। সমাবেশে আসা শিক্ষকদের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ৩০০ স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করবেন।
দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি মোট মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৯ হাজার। যেখানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক এবং ১ কোটি ৬৫ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাণভোমরা হলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি নতুন বাংলাদেশ। এ আন্দোলনের স্লোগানগুলোর অন্যতম ছিল—‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।
বৈষম্যের শিকড় উপড়ে ফেলার জন্যই শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অথচ খোদ শিক্ষাব্যবস্থায়ই রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িত শিক্ষক-কর্মচারীরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে তুলনা করলে ব্যাপক বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয়, অন্য যে কোনো সেক্টরের চাকরিজীবীদের চেয়েও বেতন ও সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার। বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। দেশে সরকারি শিক্ষকদের ঈদ, পূজা ও অন্যান্য উত্সবের সময় উত্সব ভাতা দেওয়া হয় মূল বেতনের শতভাগ, সেখানে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেওয়া হয় মূল বেতনের চার ভাগের এক ভাগ, কর্মচারীদের দেওয়া হয় অর্ধেক। তিনি বলেন, শিক্ষকদের অভাব-অনটনের সংসারে শুধু স্বপ্ন বুননই চলতে থাকে। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখা যায় না।
প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী নীতিমালার:শিক্ষক নেতা ও শিক্ষাবিদরা বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ১. বেতন বৈষম্য দূরীকরণ: সরকারি শিক্ষকদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বেতনের সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমন্বয় সাধন করতে হবে, যাতে তারা পরিবার নিয়ে সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। ২. সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি: বাড়িভাড়া, চিকিত্সা ভাতা, উত্সব ভাতাসহ সকল সুযোগ-সুবিধা সরকারি শিক্ষকদের সমপর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। বদলি ব্যবস্থা চালু করা এবং পেনশন সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি। ৩. এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ার সরলীকরণ: বর্তমানে অনেক যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক এমপিওভুক্তির বাইরে রয়ে গেছেন। এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বচ্ছ করে সকল যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা উচিত। ৪. শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন: শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন। ৫. নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বারোপ: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সমস্যাগুলোকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষাবিদরা যা বলেন: শিক্ষকতা মহান পেশা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা কতটুকু মহান, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের এমন দিন খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে, যেদিন শিক্ষকরা দাবি দাওয়া নিয়ে মাঠে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দুই জন অধ্যাপক গতকাল জানান, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ড সোজা করে রাখার কারিগর হলেন শিক্ষকরা। যদি এই কারিগররাই নিজেদের বঞ্চনার শিকার হন, তবে সেই মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের স্বার্থে, শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে এবং মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তবেই একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে।
