ঢাকা
logo
প্রকাশিত : August 13, 2026

সীমান্ত কারবারে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা, দোয়ারাবাজারে মাদ্রাসা শিক্ষায় ধস

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পড়াশোনার পরিবর্তে সীমান্ত কারবারে শ্রমিক হিসেবে জড়িয়ে পড়া, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অনুপস্থিতি, শিক্ষক সংকট এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল দুটিই নাজুক হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে উপজেলার ১০টি প্রতিষ্ঠানের চিত্রই হতাশাজনক। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি কোনো শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উপজেলার একমাত্র ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী কলাউড়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ফলাফলও আশানুরূপ হয়নি। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৭৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র ২৫ জন। জিপিএ-৫ পায়নি কেউ।

লামাসানিয়া আলিম মাদ্রাসায় ৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২২ জন। ইসলামপুর ছিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ৪৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছে মাত্র ১২ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৩০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।

উপজেলার মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভালো ফল করেছে দারুল হেরা মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৭৫ শতাংশ। তবে সামগ্রিকভাবে ১০টি প্রতিষ্ঠানের ফলাফলেই বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।

কলাউড়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মাওলা আব্দুছ সাত্তার বলেন, সিলেবাস পরিবর্তনের পাশাপাশি উঠতি বয়সী ছেলেদের একটি অংশ পড়াশোনা বাদ দিয়ে সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারে শ্রমিকের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও শিক্ষক সংকটও রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাওলানা কালিম উল্যাহ বলেন, ‘শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং সীমান্ত কারবারে শিক্ষার্থীদের শ্রমিক হিসেবে জড়িয়ে পড়াসহ অভিভাবকদের অসচেতনতা—এসবই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। আগামীতে যাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন।’

লামাসানিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রশীদ বলেন, ফলাফল বিপর্যয়ের কারণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগামীতে ভালো ফলাফলের জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইসলামপুর ছিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মাওলানা মোহাম্মদ আলী ভুঁইয়া বলেন, সীমান্ত এলাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতা, শিক্ষক সংকট এবং সীমান্ত কারবারে জড়িয়ে পড়ার কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে।

তবে সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষকদের অমনোযোগিতার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি কিংবা সীমান্ত এলাকার বাস্তবতাকে দায়ী করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থীরা কেন নিয়মিত ক্লাসে আসছে না এবং ক্লাসের বাইরে তারা কোথায় সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকার আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সুযোগে সীমান্ত কারবারে জড়িত চক্রগুলোও কিশোরদের শ্রমিক বা বাহক হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে তাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, বিষয়টি কেবল পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, পড়াশোনায় অনাগ্রহ এবং সীমান্ত কারবারে সম্পৃক্ততা অব্যাহত থাকলে এর সামাজিক প্রভাবও ভয়াবহ হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তালিকা করে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সীমান্ত কারবারে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সীমান্তবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা দরকার। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কিশোরদের চোরাচালান চক্রে ব্যবহারের ঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট দ্রুত নিরসন, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিভাবকদেরও সন্তানের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের চলাফেরা ও কর্মসংক্রান্ত বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।

দোয়ারাবাজারের মাদ্রাসাগুলোর বর্তমান ফলাফলকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শিক্ষার এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। আর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সীমান্ত কারবারের ঝুঁকি থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে এনে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর হারানো সুনাম ও শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram