

মোঃ মেহেদী হাসান, পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: বিদ্যুৎ যেন পুঠিয়ায় এখন অতিথি, হঠাৎ আসে, একটু বসে, আবার কোনও কথা না বলেই চলে যায়। সকাল থেকে রাত, চার-পাঁচ ঘণ্টা পর পর বিদ্যুতের দেখা মিলছে বটে, কিন্তু স্থায়ী হচ্ছে না বেশিক্ষণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে দিনের পর দিন অন্ধকারে ডুবে থাকছে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা।
এই দীর্ঘ বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে শিক্ষার্থী, কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তারা। সন্ধ্যা নামলেই পড়ার টেবিলে আলো জ্বলার বদলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিদ্যুতের। মাঠে ধানের চারা পানির অপেক্ষায়, আর মিল-কলকারখানার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকছে নীরবে। বর্ষার এই সময়ে পুঠিয়ার বিস্তীর্ণ মাঠে ধান রোপণের ব্যস্ততা থাকার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বহু জমি এখনও পড়ে রয়েছে। কোথাও চাষ দিয়ে জমি প্রস্তুত, কোথাও আইল বাঁধা, শুধু পানির অপেক্ষা। শ্যালো মেশিন চালিয়ে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় সেই চেষ্টাও বারবার থমকে যাচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বৃষ্টির আশায় কেউ কেউ ধানের চারা রোপণ করলেও বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় এখন জমিতে পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তোলার বিকল্প পথ থাকলেও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে সেটিও কার্যত অনিশ্চিত। কৃষক শিশির আহম্মেদ বলেন, “বিদ্যুৎ তো থাকছেই না। তাই বেশি অপেক্ষা করছি। বৃষ্টি হলে ধান লাগাব। বিদ্যুতের ওপর ভরসা করে আর বসে থাকা যাচ্ছে না।”
কৃষির পাশাপাশি বিদ্যুতের সংকটে বড় ধাক্কা খেয়েছে পুঠিয়ার বেলপুকুর-বানেশ্বর এলাকার ডালশিল্প। রাজশাহীর বানেশ্বর দেশের অন্যতম বড় ডাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘ডালের রাজধানী’ নামে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, সারা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ডালের একটি বড় অংশ এখানকার মিল থেকেই সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের তীব্র সংকট। মিল মালিকদের দাবি, পাঁচ বছর ধরে লোকসান, পুঁজি সংকট ও ঋণের চাপে অনেক ব্যবসায়ী দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, বানেশ্বরের প্রায় ৩০০টি ডাল মিলের মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার শ্রমিকও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। চালু থাকা মিলগুলোর অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
মিল মালিকেরা বলছেন, বিদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মোটা দানার মসুর ডাল এনে কম দামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে দেশি ডালের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের লোকসান, বাজারদরের পতন এবং তার সঙ্গে বিদ্যুতের চরম সংকট, সব মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের দাবি, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ডাল আমদানির ক্ষেত্রে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা গেলে এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে দেশি ডালের দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকেরাও ডালজাতীয় ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে নীরব আঘাতটি পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। সন্ধ্যার পর বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসার সময়ই অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অপেক্ষা করতে করতে রাত বাড়ছে। কখনও মোমবাতি, কখনও মোবাইলের আলো, এই সামান্য আলোতেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না এলে অনেকে শেষ পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ছে।
অভিভাবকেরা বলছেন, নিয়মিত পড়াশোনার ছন্দ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। দিনের বেলায় পড়ার সুযোগ থাকলেও প্রচণ্ড গরমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে যখন পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়, তখনই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছে তারা।
স্থানীয় কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষেও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের প্রভাব পড়েছে। গরমে শিক্ষার্থীদের অস্বস্তি বাড়ছে। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করায় দীর্ঘ সময় ক্লাস করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুঠিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১৪ মেগাওয়াট। এত বড় ঘাটতির কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর পুঠিয়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আহসানুল করিম বলেন, “ঢাকা থেকে লোডশেডিংয়ের কোনও কিছু নেই। নাটোরে এসে সেখান থেকে আমরা বিদ্যুতের লোডশেডিং পাচ্ছি। বুঝতে পারছি না কোথায় কী হচ্ছে।”বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
তবে কর্তৃপক্ষের এই ব্যাখ্যায় ক্ষোভ কমছে না পুঠিয়াবাসীর। তাঁদের প্রশ্ন, বিদ্যুতের ঘাটতির দায় যাঁরই হোক, তার খেসারত কেন দিতে হবে কৃষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে?
একদিকে মাঠে ধানের চারা অপেক্ষা করছে পানির জন্য। অন্যদিকে পড়ার টেবিলে বসা শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছে আলোর জন্য। আর মিলের ভেতরে অপেক্ষা করছে নিস্তব্ধ যন্ত্রপাতি। সব মিলিয়ে পুঠিয়াবাসীর একটাই প্রশ্ন, বিদ্যুৎ কি আবার নিয়মিত অতিথি হবে, নাকি এই দীর্ঘ অন্ধকারই হয়ে থাকবে তাঁদের নিত্যসঙ্গী?
