

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে খুলনার পাইকগাছায় এবার পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। চাষীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পাট কর্তন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো থেকে শুরু করে তা শুকানোর কাজে।
আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে উৎপাদন ও সাম্প্রতিক সময়ে ভারি বৃষ্টিতে জলাশয়গুলো ভরাট থাকায় পাট জাগ দিতে এবার ভোগান্তি নেই কৃষকের। উৎপাদনের পাশাপাশি দাম ভাল পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কৃষকের মুখে তাই হাসির ঝিলিক। ধারণা করা হচ্ছে, খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে সুন্দরবন উপকূলীয় পাইকগাছায় এক সময়ের সোনলী আঁশ পাট চাষের হারানো ঐতিহ্য।
তথ্যানুসন্ধান ও সরেজমিন প্রতিবেদনে জানা গেছে, উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় আমান আবাদে সময়ের তারতম্যে ভর করে পাটের আবাদেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে যারা ধান কর্তনের পর পাটের আবাদ করেন। তবে খানিকটা দেরীতে শুরু হওয়া পাটেরও আঁশ ভাল হয়েছে বলে দাবি কৃষক ও কৃষি বিভাগের। তবে সর্বশেষ চলতি সময়ে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় চাষীরা স্থানভেদে পাট কর্তনের পর নদী, নালা, খাল, বিল ও পার্শ্ববর্তী ডোবায় জাগ দেওয়া, আবার কোথাও কোথাও পাট ধোঁয়া এবং শুকানোর পর তা হাট-বাজারে বিক্রিসহ সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি বছর উপজেলায় মোট ২৮৩ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে গদাইপুর, হরিঢালী, কপিলমুনি, রাড়ুলী ও পৌর এলাকায় মূলত পাটের আবাদ হয়েছে। আবাদকৃত পাটের মধ্যে দেশীয়, তোষা ও অন্যান্য জাতের পাট রয়েছে।
উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের পাটচাষী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ রবিউল ইসলাম জানান, তিনি এবার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। উৎপাদনের পাশাপাশি পাট ও পাটকাঠির দাম বেশি হওয়ায় লাভ বেশী হবে। প্রতি বিঘা জমিতে চাষ, সেচ ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ থেকে শুরু করে কর্তনসহ সকল প্রক্রিয়াকরণে খরচ হবে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আবহাওয়ার অনুকূল পরিবেশে এবার পাটের আঁশ ভালো হওয়ায় বিঘা প্রতি ১০-১২ মণ কোথাও আরোও বেশি পাট পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তার পাশপাশি অন্যান্য কৃষকরা। আর এতে করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ায় আগামীতে উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছায় সোনালী আঁশের সুদিন ফিরে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মন পাট তিন হাজার টাকা থেকে তিন হাজার দু শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাট ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও পাট কেনা শুরু করেছেন। অনেকে আবার প্রান্তিক পর্যায়ে আবাদকালে কৃষকদের আগাম দাদনও দিয়েছেন। কমবেশি সেসব পাট আসা শুরু করেছে বলেও জানান তারা। সব মিলিয়ে উৎপাদন ও দাম ভাল পাওয়ায় সোনালী আঁশের পাশাপাশি কৃষকের মুখেও সোনালী হাসি বিরাজ করছে।
কৃষকরা জানান, প্রতিবছর পানির অভাবে পাট পঁচাতে (জাগ দিতে) অনেক ভোগান্তি হয় তাদের। তবে এবার বর্ষায় খানা-খন্দক ও পরিত্যক্ত ডোবা সমূহ পানিতে ভরে থাকায় বিড়ম্বনা অনেকটাই লাঘব হয়েছে।
উপজেলার কাশিমনগর এলাকার ক্ষুদ্র চাষী শেখ মুজিবর রহমান, রুহল আমীন শেখসহ অনেকেই জানান, একসাথে পাট প্রক্রিয়া করণ ও ধান রোপনের কাজ শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকটে অতিরিক্ত খরচ মেটাতে হচ্ছে। তবে পাটকাঠির দাম বেশি হওয়ায় সেটি পুশিয়ে নিচ্ছেন তারা। পাটকাঠির প্রতিটি ছোট আঁটি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকায়।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, শুরুতে বুনন মৌসুমে কৃষক পর্যায়ে পাট বীজের চাহিদা দেখে অনুমান করা গিয়েছিল আবাদ নিয়ে। পরে সার্বক্ষণিক নিরীক্ষণ ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবেশ ভাল থাকায় উৎপাদনও ভাল পেয়েছেন তারা।
পাইকগাছা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান, সরকার পাট চাষীদের সার, বীজ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করায় জনপদে গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার পাটচাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। আবহাওয়ার অনুকুল পরিবেশে উৎপাদন ভাল ও গতবারের চেয়ে দাম ভাল পাওয়ায় তাদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে পাটের সুদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে বলেও মতপ্রকাশ করেন তিনি।
