

সাইফুল ইসলাম, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের অন্যতম ঐতিহাসিক ও নান্দনিক পর্যটনকেন্দ্র দুর্গাসাগর দিঘি। শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এ জলাশয় শুধু একটি দিঘি নয়; দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বিনোদন, প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ, অতিথি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এবং শৌখিন মৎস্য শিকারিদেরও পরিচিত গন্তব্য। তবে দুর্গাসাগর দিঘি লিজের মাধ্যমে ব্যক্তি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হলে এর পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহলে।
বর্তমানে দুর্গাসাগর বরিশাল জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এ ঐতিহাসিক জলাশয়ের ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে কীভাবে হবে, সেটিই এখন স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার আওতায় গেলে দুর্গাসাগরের বর্তমান পরিবেশ ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
স্থানীয়দের মতে, ব্যক্তি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে স্বাভাবিকভাবেই লাভ-লোকসানের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। এতে অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ, নিয়মিত জাল ফেলে মাছ আহরণ কিংবা মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য ও বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে পানির স্বাভাবিক গুণগত মান ও জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্গাসাগরের অন্যতম আকর্ষণ অতিথি ও দেশীয় পাখির বিচরণ। বাণিজ্যিক মাছ চাষ ও অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ পরিবর্তিত হলে পাখির নিরাপদ আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশসচেতন ব্যক্তিরা। এতে ধীরে ধীরে পাখির বিচরণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কমে যেতে পারে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার
স্থানীয়দের আরও আশঙ্কা, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে ভবিষ্যতে দুর্গাসাগরে প্রবেশের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক নিয়ম কিংবা অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য এ ঐতিহাসিক বিনোদনকেন্দ্রটি আগের মতো সহজলভ্য নাও থাকতে পারে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শৌখিন মৎস্য শিকারিদের কাছেও দুর্গাসাগরের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় গেলে তাদের মাছ ধরার সুযোগ সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।
পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র করার দাবি
সচেতন মহলের মতে, দুর্গাসাগরের মতো ঐতিহাসিক ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়ের মূল পরিচয় হওয়া উচিত, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জনসাধারণের বিনোদন। তাই এখানে যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব, পানির গুণগত মান, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের দাবি, দুর্গাসাগরকে বাণিজ্যিক মাছ চাষের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে না তুলে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন করা হোক। পর্যটকদের জন্য বসার ব্যবস্থা, হাঁটার পথ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও নান্দনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দুর্গাসাগরকে ঘিরে বরিশালের পর্যটন সম্ভাবনাও আরও বাড়বে।
দুর্গাসাগর লিজ দেওয়ার বিষয়ে বিরোধিতা করে বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্গাসাগর আমাদের বাবুগঞ্জের একটি পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। এটি শুধু একটি জলাশয় নয়, আমাদের এলাকার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। ঐতিহাসিক এ স্থানটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার পক্ষে আমি নই।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাসাগরের উন্নয়ন হলে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব। সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে এখানে আসতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যাতে এই ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, দুর্গাসাগরের ব্যবস্থাপনা ও লিজ সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, দুর্গাসাগরকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় জনগণ, পরিবেশবিদ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একবার ঐতিহাসিক জলাশয়টির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই, ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর কি থাকবে সাধারণ মানুষের অবাধ বিনোদন ও প্রকৃতি উপভোগের জায়গা, নাকি ভবিষ্যতে তা পরিণত হবে বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার আওতাধীন একটি স্থানে? সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
