

স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা: কুমিল্লার প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। জেলার ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯৪টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকেরও ৯৭০টি পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সহকারী শিক্ষকদের নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হচ্ছে, ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদও ২ হাজার ১০৭টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১ হাজার ২১৩ জন। ফলে ৮৯৪টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৪২ দশমিক ৪২ শতাংশ বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৩ হাজার ৩৮৯টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১২ হাজার ৪১৯ জন। ফলে ৯৭০টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। এতে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শতবর্ষী এ বিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এই সময়ে পর্যায়ক্রমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ছয়জন শিক্ষক।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম বলেন, “নিয়মিত শ্রেণি পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারী শিক্ষক দেওয়া জরুরি।”
জেলার অধিকাংশ উপজেলাতেই একই চিত্র বিরাজ করছে। দেবিদ্বার, মুরাদনগর, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম, দাউদকান্দি, বরুড়া, ব্রাহ্মণপাড়া, চান্দিনা, তিতাস, মেঘনা, মনোহরগঞ্জ, সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, লাকসাম ও হোমনাসহ প্রায় সব উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি, কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রাশেদ মিয়া বলেন, “প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে যথেষ্ট সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে পাঠদানের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি একজন করে হেড ক্লার্ক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”
লাল-সবুজ উন্নয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কাওসার আলম সোহেল বলেন, “দেশের বিভিন্ন জেলার শত শত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি শিক্ষকসংকট একটি বড় সমস্যা। প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়, যার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। শিক্ষার মান ধরে রাখতে দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করা জরুরি।”
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের ভিত্তি। এই পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। সহকারী শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না। এর প্রভাব পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও পড়ে। তাই শিক্ষকসংকট দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন।”
তবে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, “২০১৯ সালের পর থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাকার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি না। তারপরও শূন্য পদ পূরণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট দূর করা এবং প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভিত্তি আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
