

রমজান আলী, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এক কিশোরকে নির্মমভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চার বছর পর অবশেষে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে সিআইডি। এ ঘটনায় অটোরিকশাচালক পারভেজকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা
ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাতে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের উঁচুর বিল এলাকায়। নিহত মোহাম্মদ বেলাল (১৩) ওই এলাকার মুন্সি মিয়ার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেই রাতে পরিকল্পিতভাবে তাকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
মামলা ও দীর্ঘ তদন্ত
লাশ উদ্ধারের পর নিহতের বাবা মুন্সী মিয়া সাতকানিয়া থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে থানা-পুলিশ তদন্ত করলেও দীর্ঘ সময়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় পরে আদালতের নির্দেশে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর সিআইডি তদন্তের দায়িত্ব নেয়।
তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তদন্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসাইন নিহত বেলালের চলাফেরা ও পরিচিতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অটোরিকশাচালক পারভেজের সন্ধান পান।
তদন্তে জানা যায়, পারভেজের অটোরিকশায় প্রায়ই চলাফেরা করত বেলাল। পরে সন্দেহের ভিত্তিতে পারভেজকে আটক করা হলে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পারভেজ জানান, বেলাল তার প্রতিবেশী হলেও তারা ঘনিষ্ঠ ছিল। তবে ইয়াবা লেনদেন ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাতে বেলালকে কৌশলে ডেকে আনা হয় একটি কলেজ মাঠে। সেখানে আগে থেকেই পারভেজসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিল। তারা বেলালের কাছে ইয়াবা ও টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে পাশের একটি সেতুর ওপর নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে হাত-পা চেপে ধরে ধারালো কোদাল দিয়ে তার গলা ও পায়ে আঘাত করা হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
লাশ গুমের চেষ্টা
হত্যার পর প্রমাণ গোপন করতে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। লাশের পরিচয় গোপন রাখতে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাথার চুল কেটে ফেলা হয়। ঘটনাস্থলের রক্তের দাগ মুছে ফেলতে পানি ঢেলে দেওয়া হয়।
প্রায় ২০ থেকে ২১ দিন পর বন্য শিয়ালের দল পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে লাশের অংশ বের করে আনলে পরিবার পোশাক দেখে বেলালের মরদেহ শনাক্ত করে।
সিআইডির বক্তব্য
সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, “ক্লুলেস এই মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। ইয়াবা ব্যবসার লাভের অংশ না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে কিশোরকে হত্যা ও লাশ গুম করা হয়। শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।”
পরিবারের দাবি
নিহতের বাবা মুন্সী মিয়া বলেন, “আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল। যাকে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, সেই পারভেজই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আমি সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

