

নুরুল ইসলাম আসাদ, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের ৩নং ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের পথ নিয়ে বিরোধের জেরে অর্ধশতাধিক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, তারা যেন নিজ গ্রামেই এক অদৃশ্য অবরোধের মধ্যে আটকা পড়েছেন। স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সবচেয়ে মৌলিক অধিকার-নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল-ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং দুর্ভোগে ভরা।
ভুক্তভোগীরা জানান, সাগর এগ্রো ফার্ম এর মালিক সাগর হোসেন, জাহিদ রানা এবং অত্র ফার্মের ম্যানেজার হৃদয়ের প্রভাবকে কেন্দ্র করে এলাকায় এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। স্থানীয়দের দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা নিজেদেরকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা মনে করছেন, যেখানে স্বাভাবিক নাগরিক সুবিধা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো জরুরি চিকিৎসা সেবা। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গভীর রাত বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের জন্য এই অবস্থা এলাকাবাসীর মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের চিত্র আরও বেদনাদায়ক। সরেজমিনে সাংবাদিকরা ঘুরে দেখেছেন, সাগর এগ্রো ফার্ম-এ যাওয়ার দুটি প্রধান রাস্তায় মোট তিনটি গেট স্থাপন করে তালাবদ্ধ রাখা হয় রাত ৮টা থেকে সকাল ৯-৯:৩০টা পর্যন্ত। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন অতিরিক্ত বিকল্প পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। যে পথ অতিক্রম করতে আগে ১০-১৫ মিনিট লাগত, এখন সেখানে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগছে এবং পায়ে হেটে যেতে হচ্ছে সম্পূর্ণ পথ। এতে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো স্কুলে পৌঁছাতে পারছে না যা শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জন্য পরিস্থিতি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে ধান কাটার মেশিন এলাকায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার কারণে ৩ দিন বিলম্ব করায় প্রায় ২০০ মণ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতির ফলে বহু কৃষক আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং বছরের প্রধান আয়ের একটি বড় অংশ হারিয়েছেন।
শুধু ধান উৎপাদন নয়, সার, বীজ, কীটনাশক, মাছের খাদ্য এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত ভারী সরঞ্জাম আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী ও কৃষকরা জানান, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কাজের গতি কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরো এলাকার কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন শিবপুরের সর্বস্তরের মানুষ। এলাকাবাসী একযোগে তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। শিবপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে সাতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিনও জোরালো বক্তব্যে দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং কৃষক-সকল শ্রেণির মানুষ প্রতিদিন অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে নানাভাবে কষ্ট সহ্য করছেন। সামাজিক অনুষ্ঠান, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং রোগীদের চিকিৎসা-সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের মতে, এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রত্যাশা-প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ। তারা চান, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চলাচলের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাভাবিক যাতায়াত নিশ্চিত করা হোক। তাদের বিশ্বাস, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার আবারও স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারবে।

