

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট (আরএনপিপি) থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বা ট্যারিফ এখনো নির্ধারিত হয়নি। অথচ রূপপুর কেন্দ্রে ১৩ মে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, আগামী নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, রূপপুর কেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ কত হবে সে বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। বিপিডিবিই কেন্দ্রটির উৎপাদিত বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা হবে এবং পরে তা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত বিতরণ কম্পানির কাছে বিক্রি করবে। তিনি বলেন, দেড় বছর ধরে বারবার চিঠি ও অনুস্মারক পাঠানো হলেও রূপপুর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের মোট ব্যয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) খরচসহ প্রয়োজনীয় তথ্য বিপিডিবিকে দেয়নি।
এসব তথ্য ছাড়া ট্যারিফ নির্ধারণ এবং সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ ‘বাল্ক ট্যারিফ’ হিসেবে নির্ধারিত হবে জানিয়ে বিপিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, কেন্দ্রটির নকশাগত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর বিবেচনায় রেখে ট্যারিফ নির্ধারণ করা উচিত। কম সময় ধরে হিসাব করলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে এবং সরকারের ওপর অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. জালাল আহমেদ বলেন, রূপপুর কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য এখনো কোনো প্রস্তাব কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়নি।
এটি যেহেতু ব্যয়ভিত্তিক প্রকল্প, তাই ট্যারিফ নির্ধারণে জনশুনানির প্রয়োজন নাও হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণে সরকার স্বচ্ছতা দেখাচ্ছে না এবং বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করতে চাইছে না।’ তিনি বলেন, ‘ট্যারিফ নির্ধারণ একটি কারিগরি হিসাবের বিষয়। কিন্তু এই হিসাব কে করছে, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) নাকি রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) চুক্তি এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণও সম্ভব হচ্ছে না।
তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করা যেত বলে তিনি মন্তব্য করেন।তিনি বলেন, বিদ্যুতের ট্যারিফ শুধু উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে ট্রান্সমিশন ব্যয়, স্পিনিং রিজার্ভসহ অন্যান্য খরচও যুক্ত থাকে। ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। বিপিডিবি কার সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করবে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন নাকি এনপিসিবিএল এ নিয়েও স্পষ্টতা নেই। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক কমিশনের বক্তব্যেও অসংগতি রয়েছে। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করে ট্যারিফ নির্ধারণ করা উচিত ছিল। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জীবনকাল প্রায় ৮০ বছর এবং ঋণ পরিশোধে কয়েক দশক সময় লাগবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ট্যারিফ রেগুলেশন ও পর্যালোচনা কাঠামো এখনই তৈরি করা প্রয়োজন। ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ট্যারিফ নির্ধারণের আগে অংশীজনদের নিয়ে উন্মুক্ত শুনানি হওয়া উচিত ছিল। কোন কোন ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, কিভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ট্যারিফ কিভাবে সমন্বয় হবে, এসব বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম রূপপুর প্রকল্পের ফরেনসিক, কারিগরি ও জ্বালানি নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানান। পাশাপাশি ট্যারিফ নির্ধারণের আগে বিস্তারিত ব্যয় বিশ্লেষণ প্রকাশেরও দাবি জানান তিনি।
গ্রিডে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তুতি চললেও বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিশেষজ্ঞরা ও বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, বর্তমান সঞ্চালনব্যবস্থা রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কতটা কার্যকরভাবে গ্রহণ করতে পারবে, সে বিষয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে। তিনি পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সঞ্চালনব্যবস্থার ফ্রিকোয়েন্সি যদি মানদণ্ড ৪৯ হার্টজের নিচে নেমে যায়, তাহলে গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে ৫০ হার্টজের ওপরে ফ্রিকোয়েন্সি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ফ্রিকোয়েন্সি কমে গেলে জাতীয় গ্রিড ট্রিপ করার ঝুঁকি থাকে।
পিজিসিবি চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ খানও ফ্রিকোয়েন্সি ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গ্যাস, কয়লা, সৌর ও জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উৎসর বিদ্যুৎ বহনকারী একটি সঞ্চালনব্যবস্থায় স্থিতিশীল ফ্রিকোয়েন্সি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ঝড় বা অন্য কোনো কারণে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেলে ফ্রিকোয়েন্সিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং গ্রিড বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ শুধু সঞ্চালন কম্পানির দায়িত্ব নয়; বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পিজিসিবি চেয়ারম্যান আরো বলেন, রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রান্সমিশন লাইন ২০২৫ সালের ২ জুন সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ গ্রহণে প্রস্তুত। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে ৪৯.৫ থেকে ৫০.৫ হার্টজের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এদিকে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ রূপপুর কেন্দ্র চালুর আগে বিদ্যমান সঞ্চালনব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। গ্রিড লাইন সক্ষমতার বিষয়ে ঢাবির নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য ২৩০ কেভি গ্রিড লাইনের কাজ প্রায় শেষ হলেও ৪০০ কেভি লাইনের কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে রিঅ্যাক্টরের টারবাইন জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত (সিনক্রোনাইজ) করার সময়ই বোঝা যাবে গ্রিড কতটা স্থিতিশীল। বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজের ওঠানামা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাভাবিকভাবে ৫০ হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। যদি গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে, তাহলে রিঅ্যাক্টরের কুলিং সিস্টেম সচল রাখতে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকআপ প্রয়োজন হবে। এ জন্য একটি ডেডিকেটেড স্পিনিং রিজার্ভ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিশেষ বিদ্যুৎ লাইন থাকার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে জাতীয় গ্রিড ব্যর্থ হলেও জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা যায়।’
