

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন বিডিআরের তৎকালীন কর্মকর্তা লে. কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হন)। তিনি হত্যাকাণ্ডের আগের দিনও হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় সাধন করেছেন। বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ১৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
বিডিআর কমিশনের প্রতিবেদনে শামসুল আলম চৌধুরীকে ষড়যন্ত্র, হত্যাকারীদের হত্যাকাণ্ডে সুযোগ করে দেওয়া এবং দেশ ও জাতির কাছে সত্য লুকানোর অভিযোগ এনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম চৌধুরী (তৎকালীন লে. কর্নেল) বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় পিলখানায় ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পূর্বে তিনি হত্যাকারীদের সঙ্গে তৎকালীন এমপি শেখ সেলিমের যোগাযোগ করিয়ে দেন। হত্যাকাণ্ডের পূর্বের দিনও হত্যাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন সমন্বয় সাধন করেছেন। ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে তিনি হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিকের বাসায় অবস্থান করেন। সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিকের বাসা থেকে মোবাইলে তিনি সর্বক্ষণ যমুনায় অবস্থানরত তৎকালীন ডিজি এসএসএফ মেজর জেনারেল আবেদীনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি পিলখানার বাইরে এসেছিল। লে. কর্নেল শামসের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে দুইবার পিলখানার বাইরে নিউমার্কেট এলাকায় স্থান পরিবর্তন করে। তৎকালীন এমপি গোলাম রেজা লে. কর্নেল শামসকে দরবার হল এলাকায় মুক্তভাবে চলাচল করতে দেখেছেন। তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা থেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় বের হয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০০৯ সালে গঠিত সেনা তদন্ত আদালতের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বিডিআর কমিশনের প্রতিবেদনে লে. কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ডিজিএফআই থেকে বারংবার তদন্ত চলার সময় টেলিফোনের মাধ্যমে হুমকি, বিভিন্ন নির্দেশ প্রদানের ফলে তদন্ত আদালতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে ও বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়াও তাদের হুমকির কারণে তদন্ত আদালতের সদস্যদের বিচলিত হতে দেখা যায়। বিশেষ বিশেষ সাক্ষীর ক্ষেত্রে তাদের স্পষ্ট নির্দেশিকা যেমন- লে. কর্নেল শামসের ক্ষেত্রে পালন করতে হয় (সূত্র : সাক্ষী নম্বর-৫৩)।
২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সচিব আনিস-উজ জামানের নেতৃত্বে জাতীয় যে তদন্ত কমিটি হয়, সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও এ ঘটনার অন্যতম সন্দেহভাজন হিসেবে কর্নেল শামসের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অধিনায়ক কর্নেল শামসসহ ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্যদের ভূমিকা সন্দেহজনক। ঘটনার সূচনালগ্নে সরাসরি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনকারী বিডিআরের ডিএডি, জেসিও এবং সৈনিকদের ইউনিটভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের অনেকেই ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য।
বিদ্রোহের পর বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার সময় ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে বলে উল্লেখ করেন। আনিসুজ্জামান কমিটির তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পিলখানায় আসা উপলক্ষে চিফ সিকিউরিটি অফিসারের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসকে।
দরবারের নিরাপত্তাসহ সব প্রশাসনিক আয়োজনের দায়িত্বও ছিল তার। বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের পর দেখা যায়, ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের মোট চারজন কর্মকর্তার মধ্যে অধিনায়ক লে. কর্নেল শামসসহ সবাই প্রাণে বেঁচে যান এবং তারা বিপথগামী বিডিআর জওয়ানদের বাসায় ছিলেন। এ বিষয়ে আনিসুজ্জামানের তদন্ত কমিটি অধিকতর তদন্তের দাবি রাখে বলে তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানায় বিডিআর দরবার শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ৪৪ ব্যাটালিয়নের সদস্য সিপাহি মঈন একটি অস্ত্র নিয়ে মঞ্চে উঠে বিডিআরের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিলের মাথায় তাক করেছিলেন। একজন অফিসার তাকে নিরস্ত্র করেন। সিপাহি মঈনের হাতে থাকা অস্ত্রটি দেখে বিডিআর ডিজি তখন কর্নেল শামসকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘শামস, এই অস্ত্র তোমার ব্যাটালিয়নের।’

