

জিহাদ রানা, বরিশাল ব্যুরো চীফ: পান্ডব নদী যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নের জনপদগুলো। কয়েক বছর আগে নদীর বুকে হারিয়ে গেছে আমিনপুর নামের একটি পুরো গ্রাম। এখন একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ সাদিস। প্রতিদিন নদীর ভাঙনে একটু একটু করে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও পারিবারিক কবরস্থান। নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের কাছে প্রতিটি দিন এখন নতুন আতঙ্কের নাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ সাদিস গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে পান্ডব নদীর গর্ভে চলে গেছে। একসময়ের জনবহুল এলাকাজুড়ে এখন শুধু নদীর উত্তাল স্রোত আর ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ফকির বাড়ি জামে মসজিদ ও দক্ষিণ সাদিস মাদ্রাসা। এর আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দক্ষিণ সাদিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রামের পর গ্রাম হারিয়ে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে এক নিঃশব্দ বিপর্যয়।
ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অনেকেই নিজেদের শেষ সম্বলটুকু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে। কিন্তু সেই সড়কও এখন নিরাপদ নয়। গত এক সপ্তাহ ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙন শুরু হওয়ায় আবারও নতুন করে উদ্বেগে পড়েছেন বাস্তুচ্যুত মানুষ। তাদের প্রশ্ন, যদি এই সড়কটিও নদীতে হারিয়ে যায়, তাহলে কোথায় যাবে তারা?
স্থানীয়রা জানান, বর্ষা এলেই পান্ডব নদীর স্রোত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। প্রতিদিনই নদীর পাড় ধসে পড়ছে। রাতের আঁধারে ঘুম ভেঙে অনেক পরিবারকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে। কেউ হারিয়েছেন কৃষিজমি, কেউ ফলের বাগান, আবার কেউ হারিয়েছেন পৈতৃক ভিটা। জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিজমি নদীতে বিলীন হওয়ায় অসংখ্য কৃষক এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর নদীশাসনের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। আমিনপুর গ্রাম হারিয়ে যাওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আজ দক্ষিণ সাদিসও অস্তিত্ব সংকটে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু সালে বলেন, আমিনপুর গ্রাম এখন শুধু স্মৃতি। আমাদের চোখের সামনে পুরো একটি গ্রাম নদীতে হারিয়ে গেছে। শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। তারপরও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন দক্ষিণ সাদিসও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই গ্রামটিও মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
এলাকাবাসীর দাবি, সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে দায়সারা ব্যবস্থা নয়, বরং দ্রুত টেকসই নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় পান্ডব নদীর ভাঙনে শুধু দক্ষিণ সাদিস নয়, আশপাশের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, দক্ষিণ সাদিস গ্রামে পান্ডব নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। খুব দ্রুত প্রকৌশলীদের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পান্ডব নদীর অব্যাহত ভাঙন এখন শুধু একটি গ্রামের সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলের জন্য পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয়দের আশা, আর কোনো জনপদ যেন আমিনপুরের মতো ইতিহাস হয়ে না যায়, সেজন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
