

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের অন্যতম জেলা রাজবাড়ী। সাড়াদেশের এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় এ জেলায়। তবে এবার পেঁয়াজের ভালো ফলনের পরও হাসি নেই কৃষকের মুখে। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ অনেক বেশি। এতে চাষাবাদ খরচ বাড়ায় পাট ও তিল চাষীরাও বিপাকে পড়েছেন। এ ছাড়া আগাম আউশ ধান রোপণের চারা তৈরিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। তেলের দাম বাড়ায় জমি থেকে পেঁয়াজ তোলা এবং বাজারে পৌঁছানোর পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
কালুখালী উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পেঁয়াজ তো ভালো হইছে, কিন্তু বাজারে নিলে ট্রাক ভাড়া দিতেই অর্ধেক টাকা শেষ। ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ যদি এই সময় বাজারে আসে, তবে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। ৬ লাখ টন পেঁয়াজ কই রাখমু আর কার কাছে বেচমু, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।’
এদিকে পেঁয়াজ তোলার পরপরই এই অঞ্চলের কৃষকরা পুরোদমে পাট ও তিল চাষে মনোনিবেশ করেন। তবে অনাবৃষ্টির কারণে এবার শুরুতেই সেচ দিতে হচ্ছে। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের খরচ গত বছরের তুলনায় বিঘা প্রতি প্রায় ৫০০-৭০০ টাকা বেড়ে গেছে।
এছাড়া সামনে আগাম আউশ ধান রোপণের মৌসুম। রাজবাড়ীর অধিকাংশ কৃষক বৃষ্টির ওপর নির্ভর করলেও চারা রোপণ ও প্রাথমিক সেচের জন্য ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেলের বর্তমান বাজারদরে আউশ আবাদ করলে লাভের মুখ দেখা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন চাষীদের অনেকে।
সদর উপজেলা চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি সামসুল ইসলাম ও সুলতানপুর এলাকার কৃষক সাজাহান ফকির বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়তি। সার, বিষ আর কামলার (শ্রমিক) দাম তো আছেই, তার ওপর তেলের দাম বাড়ায় এখন সেচ দিতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে। এভাবে চাষ করলে ফসল বেচে চাষের খরচও উঠবে না।’
বালিয়াকান্দির আদশ চাষী জাকির হোসেন জানান, ‘সেচ সংকটের কারণে অনেক জমি নতুন চাষের জন্য তৈরি করতে খরচ বাড়বে। সময়মতো পানি দিতে না পারলে জমি শুকিয়ে যাবে। লস দিয়ে কতদিন আবাদ করব?’
পাংশা উপজেলার কলিমোহর গ্রামের চাষী বরকত হোসেন বলেন, ‘তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, আউশ ধান রোপণ করতে গেলে তেলের দাম দিতেই মূলধন শেষ হয়ে যাবে।’
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলায় পেঁয়াজের বিশাল মজুত থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় কৃষকরা তড়িঘড়ি করে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি কৃষকের লভ্যাংশে আঘাত হানছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, অন্যান্য ফসলে খুব একটা প্রভাব না পড়লেও পেঁয়াজ বাজারজাতকরণ নিয়ে বিপাকে পড়বেন কৃষক।
জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, এবার প্রায় ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এর বেশিরভাগ মাঠ থেকে উঠে গেছে। এখন বাজারজাত করণের পালা। কিন্তু হঠাৎ জালানি তেলের দাম বাড়ায় এই পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজার গুলোতে নিতে পরিবহন খরচ বাড়বে। বিশেষ করে রাজবাড়ীর পেঁয়াজ চট্রগ্রাম যায় বেশি, সেখানে বড় ধাক্কা খান কৃষক। এছাড়া তিল ও অন্য ফসলে খুব বেশি প্রভাব না পড়লেও উৎপাদন খরচ বেশি পড়তে পারে।

