

পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি: মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমিয়েছিলেন কেউ। কেউ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে দিনরাত পরিশ্রম করে সঞ্চয় করেছিলেন কয়েক লাখ টাকা। আবার কেউ ছাগল পালন করে জীবনের শেষ সম্বল তুলে রেখেছিলেন ব্যাংকে। এখন সেই সব টাকার খোঁজ নেই। রাজশাহীর পুঠিয়ার ধোপাপাড়া বাজারে প্রাইম ব্যাংকের এক এজেন্ট ব্যাংকিং শাখাকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পলাতক শাখা পরিচালক সুমন আলী মন্ডল।
স্থানীয়দের দাবি, গত ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যার পর থেকেই নিখোঁজ সুমন। ধোপাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুমন আলী মন্ডল ‘ছালেহা ট্রেডার্স’ নামে প্রাইম ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। সেই শাখা এখন তালাবদ্ধ। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শাখার সামনে ভিড় করছেন অসংখ্য ভুক্তভোগী গ্রাহক। কারও চোখে জল, কারও মুখে হতাশা। অনেকেই বলছেন, জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়ে এখন তাঁরা কার্যত পথে বসেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ধোপাপাড়া বাজারের ওই এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার শাটার নামানো। আশপাশের দোকানিরা জানান, কয়েক দিন ধরেই শাখাটি বন্ধ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহু গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ টাকা নেওয়া হলেও তা মূল ব্যাংকে জমা করা হয়নি। কাউকে ব্যাংকের রসিদ, আবার কাউকে ব্যক্তিগত খাতায় হিসাব লিখে লেনদেন চালাতেন সুমন।
টিভি মেকানিক শামীম আহমেদের কথায়, “ছয় লাখ টাকা জমা দিয়েছিলাম। মেয়ের বিয়ে আর ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য টাকা জমাচ্ছিলাম। এখন অ্যাকাউন্টে এক টাকাও নেই।”
ধোপাপাড়া হাটের পাহারাদার আজাহার আলীর অভিযোগ, “আমি আর আমার স্ত্রী মিলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা রেখেছিলাম। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আক্কাস আলী জানান, তাঁর জমা রাখা ৭ লক্ষ ১৩ হাজার টাকার মধ্যে অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র ৮ হাজার টাকা। বিধবা মমতা বেগম বলেন, “ছাগল পালন করে তিন লাখ টাকার বেশি জমিয়েছিলাম। এখন দেখাচ্ছে মাত্র ৫০০ টাকা।”
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক বৃদ্ধা গ্রাহকের ঘটনায়। তাঁর ছেলে দাবি করেছেন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেওয়ার কথা বলে বৃদ্ধার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে গোপনে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সুমন আলী গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাংকের সিস্টেমে জমা না করে নিজের কাছেই রাখতেন। ফলে হাতে রসিদ থাকলেও ব্যাংক হিসাব বলছে ভিন্ন কথা।
এদিকে অভিযুক্ত সুমনের বাবা মনসুর রহমান জানান, “১৮ এপ্রিলের পর থেকে ছেলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। থানায় জিডি করেছি। প্রতিদিন লোকজন বাড়িতে এসে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন।”
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন প্রাইম ব্যাংকের বানেশ্বর শাখার ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলমও। তিনি বলেন, “বেশ কয়েকজন অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।” যদিও এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
ঘটনা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, এত বড় অঙ্কের লেনদেন চললেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কী ভাবে কিছু টের পেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ইতিমধ্যেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও এসেছে। পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান বলেন, “ঘটনাটি শুনেছি। তদন্ত করে সত্যতা মিললে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, অন্তত ২ থেকে ৫ কোটি টাকার আমানত নিয়ে উধাও হয়েছেন ওই এজেন্ট। যদিও প্রকৃত অঙ্ক কত, তা স্পষ্ট হবে তদন্তের পরেই। তবে আপাতত ধোপাপাড়ার বহু পরিবারে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। কেউ বলছেন, সর্বস্বান্ত হয়েছেন। কেউ আবার চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলছেন— “ব্যাংকে টাকা রেখে যদি নিরাপত্তা না পাই, তাহলে যাব কোথায়?”

