ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 12, 2026

ব্যাংকিংয়ে খুলে যাক সুশাসনের দরজা!

অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাজার স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিধারায় একটি দেশের ব্যাংকিং খাত মূলত তার হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যখনই কোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে নীতি-নৈতিকতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ধস নেমেছে, তখনই সার্বিক অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পূর্ব এশীয় আর্থিক সংকটের সময় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু একটি আর্থিক খাতকে ডুবিয়ে দেয় না, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যৎ থমকে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বিশেষ করে বর্তমান রূপান্তরকালীন বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের সঠিক পরিচালনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তাই আজ যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আর বি আই) গত এক দশকে তাদের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা এবং 'ফিট অ্যান্ড প্রপার' নীতি বাস্তবায়নে নজির বিহীন কঠোরতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে, কেন্দ্রীয় আর্থিক কাঠামোর নড়বড়ে নীতি এবং তদারকির অভাব কীভাবে একটি দেশকে চোখের পলকে দেউলিয়া করে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিগত এক-দেড় দশকে যা ঘটেছে, তাকে বলনীতি নির্দেশনার ব্যত্যয় নয়, বরং সার্বিক ব্যাংকিং কাঠামোর ওপর এক চরম রাজনৈতিক হঠকারিতা ও সুপরিকল্পিত লুটপাট। খেলাপি ঋণের অভূতপূর্ব পাহাড়, নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বেনামী ঋণ বিতরণ এবং সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পরিচালনা পর্ষদ দখলের মাধ্যমে দেশের পুরো অর্থ ব্যবস্থাকে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই বিশাল আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও কাঠামো গত অপরাধের কেন্দ্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে নীরবে অথচ মরণঘাতী ছোঁবল মেরেছে, তা হলো ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ অবক্ষয়। ব্যাংকিং একটি নিখাদ আস্থা ও বিশ্বাসের পেশা, যেখানে মেধা ও সততাই একমাত্র মুদ্রা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে অনিয়ম তান্ত্রিক নিয়োগ, রাজনৈতিক তোষণ এবং আঞ্চলিক তার প্রভাবে যোগ্যতাহীন ব্যক্তিদের শীর্ষ ও মধ্যম সারির পদে বসানো হয়েছে।

কোনো ধরনের স্বচ্ছ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা ছাড়াই কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে কয়েক হাজার প্রার্থীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যাদের বহু জনের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদই ছিল জাল! শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মচারীদের পর্যন্ত ভূয়া দলিল ও সনদে চাকরি পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনসকে কতটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ দ্বারেই অনিয়ম ও মিথ্যার রাজত্ব, সে প্রতিষ্ঠানের কাছে আমানত কারীর কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা কিংবা নিরপেক্ষ কমপ্লায়েন্স আশা করা অবাস্তব।

বিদ্যমান এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশের ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি যে যুগান্তকারী নির্দেশনা জারি করেছে, তা সুশাসন ফেরানোর পথে এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের সকল স্তরের কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি যাচাই সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এন্ট্রিলেভেলের চাকরির ক্ষেত্রে আবশ্যিক ভাবে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত এবং কাঠামোগত মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মেধাবী প্রার্থীর নিয়োগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধের কঠোর শাস্তি হিসেবে যার সনদে জালিয়াতি মিলবে, তাকে শুধু চাকরিচ্যুতই করা হবে না, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'কর্পোরেট মেমোরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে' স্থায়ী ভাবে অন্তর্ভুক্ত করে চিরতরে কাল তালিকা ভুক্ত করা হবে। নতুন মানব সম্পদ নীতি মালায় লিঙ্গ বৈচিত্র্য, পদোন্নতির সঠিক মানদণ্ড, কর্মক্ষেত্রের ইতিবাচক পরিবেশ এবং অনিয়মের তথ্য উন্মোচন কারীর (হুইসেল ব্লোয়ার) সুরক্ষাকে পর্ষদ অনুমোদিত নীতিতে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী একটি আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো দক্ষ, নিরপেক্ষ ও সুশিক্ষিত কর্মী বাহিনী। ব্যাংকে যখন যোগ্য তার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নিয়োগ হয়, তখন সেই কর্মী বাহিনী বেআইনি সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক চাপ কিংবা ঊর্ধ্বতনদের অনৈতিক আদেশের সামনে মাথা নত করে না। সৎ এবং দক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তারা আর্থিক খাতের প্রথম রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতি মালা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিমণ্ডলে তার ক্ষয় প্রাপ্ত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে, যা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফ ডি আই) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তবে কাগজ-কলমের সার্কুলারকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, যারা এতকাল অনিয়মের সুবিধা পেয়ে এসেছে, তারা এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। উপরন্তু, অল্প সময়ের মধ্যে দেশের হাজার হাজার ব্যাংক কর্মকর্তার শিক্ষাগত সনদ দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফল ভাবে যাচাই করা একটি বিশাল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। তাই কেবল নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট তদারকি সেলের মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকিং খাতকে দুর্নীতি ও নোংরা রাজনীতির বিষাক্ত থাবা থেকে মুক্ত করতেই হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকঠোর ও সময়োপযোগী সংস্কারের যাত্রা শুরু করেছে, তা সঠিক ভাবে প্রতিপালিত হলে ব্যাংকিংয়ে সুশাসনের রুদ্ধ দরজা নিশ্চিত ভাবেই উন্মোচিত হবে। সততা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সুশাসিত ব্যাংকিং ব্যবস্থাই কেবল সাধারণ আমানতকারীর কোটি কোটি টাকা সুরক্ষা দিতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির দরবারে বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি জোগাতে পারে।

লেখক: আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিকবিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমারদিন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram