ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 21, 2026

শিল্প-অর্থনীতির জ্বালানি নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনায় ৫টি টার্মিনাল–৩শ গ্যাসকূপ

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিগত কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতি যেভাবে কৃষিভিত্তিক কাঠামো থেকে দ্রুতগতিতে শিল্পমুখী অর্থনীতির দিকে প্রসারিত হয়েছে, তা অভাবনীয়। তবে এই বিপুল উন্নয়ন সম্ভাবনার পথকে মসৃণ রাখতে এবং কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদানটি হলো টেকসই ও সুনিশ্চিত জ্বালানি খাত। প্রকৃতপক্ষে জ্বালানি হলো যেকোনো গতিশীল অর্থনীতির মূল রক্তপ্রবাহ। শিল্পকারখানার উৎপাদন অক্ষুণ্ণ রাখা, রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। এই সার্বিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সমন্বিত ও ভিশনারি নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এক যুগান্তকারী দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাস পূর্ণ হওয়ার এই সময়ে দাঁড়িয়ে সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়ন করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। প্রশাসনিক স্তরে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দূরদর্শী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় এক নতুন সম্ভাবনাময় যুগের সূচনা হয়েছে। নতুন সরকারের ঘোষিত এই মহাপরিকল্পনার মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে দুটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর। একদিকে দেশে তিনটি ভাসমান ও দুটি স্থলভিত্তিকসহ মোট পাঁচটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান জোরদার করে পর্যায়ক্রমে সর্বমোট ৩০০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অতিবাহিত এই সাত মাসে প্রশাসনিক গতিশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভূতপূর্ব সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং সরবরাহশৃঙ্খলের নানা জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সরকারের গৃহীত বাস্তবমুখী সামাজিক-অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো দেশের সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলেও বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিকটি হলো সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে তার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাময়িক বা তড়িঘড়ি কোনো পথ বেছে না নিয়ে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে, তা বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে নিজস্ব পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। এই স্বল্প সময়ে দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে যে নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি।

দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাহিদা ও দ্রুত প্রসারমান শিল্পায়নের গতি ধরে রাখতে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিস্তারিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে তিনটি হবে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ এবং দুটি হবে স্থলভিত্তিক টার্মিনাল। বর্তমানে দেশে চালু থাকা দুটি এফএসআরইউর সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় প্রতিদিন ১,৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে সরকার পরিকল্পিত নতুন তিনটি এফএসআরইউ যুক্ত হলে দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতায় বিশাল এক পরিবর্তন আসবে।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রের কুতুবজোম এলাকায় চীনের একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিটুজি উদ্যোগের আওতায় একটি সুবিশাল এফএসআরইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ২৮ জুলাই এই প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার এই টার্মিনালটি ২০২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারে, যা জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করবে। বড় আকৃতির জাহাজে সরাসরি এলএনজি আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানিকৃত গ্যাসের পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পায়রা বা মোংলা বন্দরের কাছাকাছি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে, যা এই এলাকার ভারী শিল্পায়নে নতুন গতির সঞ্চার করবে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে বার্ষিক ৭.৫ মিলিয়ন টন সক্ষমতার প্রথম স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পেট্রোবাংলা জোরকদমে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে, যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সমমানের আরও একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।

আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাসের প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকারের পরিকল্পনাও অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই বৃহৎ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে দেশকে সর্বমোট ৩০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যার প্রথম ধাপে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন করা হবে এবং দ্বিতীয় ধাপে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক স্বাধীনতায় শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকানো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

বাংলাদেশ আজ তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, চামড়া, স্টিল ও সিমেন্ট শিল্পে বিশ্বের বুকে এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। অতীতে গ্যাস-সংকটের কারণে বিভিন্ন সময়ে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত এই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপরেখা তাই দেশের উদ্যোক্তাদের নতুন করে পথচলার সাহস জোগাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গ্রিডে নতুন করে বিশাল অঙ্কের গ্যাস যুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ায় শিল্পমালিকরা এখন নিশ্চিন্তে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা করতে পারছেন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে দেশীয় কারখানার পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের চরম অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে সরকার অত্যন্ত জনসংবেদনশীল নীতি গ্রহণ করেছে। প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে, কারণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে সরকার এই খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের কাজও দ্রুত শুরু করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জিটুজি প্রস্তাবের অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎস থেকে বড় মাপের অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর আস্থা রাখছে। ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে নিরপেক্ষ ও দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সম্পৃক্ত করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব পালনের প্রথম সাত মাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সফলতা।

কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি হুট করে অর্জিত হয় না; তার জন্য প্রয়োজন হয় সাহসিকতা, বাস্তবমুখী রাজনৈতিক দর্শন এবং দেশপ্রেম-নির্ভর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সাত মাসেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা গতানুগতিক ধারায় দেশ পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। শিল্প-অর্থনীতির গতি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং আগামী দিনে বাংলাদেশকে একটি টেকসই ও উন্নত অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার যে তাগিদ রয়েছে, পাঁচটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল এবং ৩০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা মূলত তারই বলিষ্ঠ বাস্তবায়ন। সুতরাং মহেশখালী, মাতারবাড়ী কিংবা পায়রা অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই শক্তি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে ইনশাল্লাহ।

আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram