ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 23, 2026

ডেঙ্গু ও গর্ভাবস্থা: মায়ের জীবন ও অনাগত শিশুকে রক্ষায় সচেতনতার সময় এখনই

এইতো গত সপ্তাহের কথা। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সী এক নয় মাসের পোয়াতী। তার ছিল প্রথমে জ্বর, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা। ভেবেছিল সাধারণ ভাইরাল জ্বর। কিন্তু দুই দিন পর শুরু হয় প্রচণ্ড পেট ব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট এবং সাথে রক্তচাপ যায় কমে। ডাক্তার দেখে পরীক্ষা দিলে ধরা পড়ে ডেঙ্গু। হাসপাতালে যখন ভর্তি হয় তখন সাথে ছিল শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। একদিন পর আইসিইউতে ডেঙ্গুর কারণে রক্তের প্লাটিলেট কমে যায় দ্রুত। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মাকে আর আইসিইউ থেকে ফেরাতে পারেনি। ফিরেনি গর্ভের শিশুটিও।

এটি শুধু একটি মায়ের মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। বাংলাদেশে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়ছে, তখন গর্ভবতী নারীরা বর্তমানে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।একটুখানি অবহেলা কেড়ে নিতে পারে মায়ের জীবন।তাই ডেঙ্গু নিয়ে সবাইকে জানতে হবে ও সতর্ক থাকতে হবে।

গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
গর্ভাবস্থা নিজেই একটি বিশেষ শরীরবৃত্তীয় অবস্থা। এই সময়ে মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রক্তের পরিমাণ, হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। ফলে এই সময়ে ডেঙ্গু হলে জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর অনেক সময় সাধারণ জ্বরের মতো শুরু হলেও কয়েকদিন পর এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে-

  • রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত কমে যেতে পারে।
  • রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • শরীরে পানিশূন্যতা ও শক (Dengue shock syndrome) তৈরি হতে পারে।
  • লিভার, কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গের ওপর চাপ পড়তে পারে।
  • প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যা। কিন্তু বর্তমানে এটা মহামারীতে পরিনত হয়েছে।

গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গুর লক্ষণ কী কী?
গর্ভবতী নারীদের ডেঙ্গুর লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ গর্ভকালীন অসুস্থতার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১. হঠাৎ উচ্চ জ্বর

  • সাধারণত ১০১-১০৪°F পর্যন্ত জ্বর হতে পারে।
    ২. প্রচণ্ড শরীর ব্যথা
  • মাথাব্যথা
  • চোখের পেছনে ব্যথা
  • মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
    ৩. অতিরিক্ত দুর্বলতা
  • ক্লান্তি
  • মাথা ঘোরা
  • ক্ষুধামন্দা
    ৪. সতর্ক সংকেত (Warning signs)
    নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে-
  • প্রচণ্ড পেট ব্যথা
  • বারবার বমি
  • নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
  • যোনিপথে রক্তপাত
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা
  • শ্বাসকষ্ট
  • প্রস্রাব কমে যাওয়া
  • হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কী পরীক্ষা করতে হবে?
গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত ডেঙ্গু হলে বেশ কিছু পরীক্ষা করা হয়। সেগুলো হলো:
১. CBC (Complete Blood Count)
এতে দেখা হয়

  • হিমোগ্লোবিন
  • শ্বেত রক্তকণিকা
  • প্লাটিলেট সংখ্যা
  • হেমাটোক্রিট (HCT)
    হেমাটোক্রিট বৃদ্ধি এবং প্লাটিলেট কমে যাওয়া ডেঙ্গুর জটিলতার সংকেত হতে পারে।
    ২. Dengue NS1 Antigen Test
  • জ্বরের প্রথম ৫ দিনের মধ্যে বেশি কার্যকর।
    ৩. Dengue IgM ও IgG Antibody
  • সাধারণত কয়েকদিন পর থেকে শনাক্ত করা যায়।
    ৪. প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা
  • লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT)
  • কিডনি ফাংশন
  • রক্ত জমাট বাঁধার পরীক্ষা (Coagulation profile)
  • আল্ট্রাসনোগ্রাম

গর্ভবতী নারীর ডেঙ্গুর চিকিৎসা কী?
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে -সে সামান্য জ্বরই হোক না কেন। মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু মানেই হাসপাতালে ভর্তি।

চিকিৎসা বলতে আসলে, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো-

  • শরীরে পর্যাপ্ত পানি বজায় রাখা
  • জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা
  • মা ও শিশুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা
    চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো
    ১. পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ
  • পানি
  • ওরস্যালাইন
  • ফলের রস
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী IV fluid
    তবে অতিরিক্ত তরল দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে, তাই হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন অবশ্যই ।
    ২. জ্বর নিয়ন্ত্রণ
    সাধারণত জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়।এড়িয়ে চলতে হবে Aspirin,Ibuprofen, Diclofenac। কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
    ৩. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ খুবই জরুরী।
    প্রয়োজনে প্রতিদিন CBC, প্লাটিলেট, রক্তচাপ পরিমাপ করতে হবে। খেয়াল করতে হবে প্রস্রাবের পরিমাণ। সেই সাথে শিশুর হার্টবিট পর্যবেক্ষণ করতে ভুললে চলবে না।

ডেঙ্গুর কারণে মায়ের কী ঝুঁকি হতে পারে?
গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য জটিলতা-
১. রক্তক্ষরণ
*ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। কখনো কখনো রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
২. ডেঙ্গু শক সিনড্রোম
*এটি সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতাগুলোর একটি। এতে রক্তচাপ অনেক কমে যায়। শরীরের অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত পায় না। তখন জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
৩. অকাল প্রসবের ঝুঁকি
*গুরুতর ডেঙ্গু হলে সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

শিশুর ওপর ডেঙ্গুর প্রভাব কী হতে পারে?
মায়ের ডেঙ্গু মানেই শিশুর ক্ষতি হবে এমন নয়। অনেক মা ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম দেন। তবে অনেক সময় শিশুর গুরুতর সংক্রমণে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সম্ভাব্য শিশুর ঝুঁকিগুলো হলো-

  • গর্ভপাত
  • অকাল জন্ম
  • কম ওজনের শিশু
  • জন্মের পর শিশুর ডেঙ্গু সংক্রমণ (বিরল ক্ষেত্রে)
  • ভ্রূণের কষ্ট (fetal distress)
    বিশেষ করে প্রসবের কাছাকাছি সময়ে মায়ের ডেঙ্গু থাকলে নবজাতককে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হতে পারে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় ডেলিভারি বা সিজারের ঝুঁকি কতটুকু?
ডেঙ্গু আক্রান্ত মায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেলিভারিতর সঠিক সময় নির্বাচন এবং মায়ের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন। তাহলে ঝুঁকি কখন বেশী? স্বাভাবিক প্রসবে নাকি সিজারে?
স্বাভাবিক প্রসব:
যদি মায়ের অবস্থা স্থিতিশীল থাকে, প্লাটিলেট গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকে, রক্তক্ষরণের ঝুঁকি না থাকে,
তাহলে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হতে পারে।
সিজারিয়ান সেকশন (C-section)
ডেঙ্গুর সক্রিয় পর্যায়ে সিজার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে কারণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া প্লাটিলেট কম থাকলে অপারেশনের জটিলতা বাড়ে।
সাথে অ্যানেস্থেশিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে অনেক বেশী।
তবে যদি শিশুর বা মায়ের জীবন বাঁচাতে জরুরি প্রয়োজন হয়, তখন চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে সিজার করতে পারেন।
মনে রাখতে হবে সিজার বা নরমাল উভয় ক্ষেত্রে রক্তে প্ল্যাটিলেট এর পরিমান থাকতে হবে নির্দিষ্ট পরিমান। তাই ডেঙ্গু রোগীর রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা পরিবারকে মনে রাখতে হবে।

গর্ভবতী নারীরা কীভাবে ডেঙ্গু থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন?
ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সুরক্ষা যেমন- দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করা, ফুলহাতা পোশাক পরা, মশা নিরোধক ব্যবহার করা, জানালায় নেট ব্যবহার করা অতীব জরুরি এই সময়ে। খেয়াল রাখতে হবে বাড়ির আশপাশ যেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। ফুলের টব, জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা, পুরনো টায়ার, ছাদ বা বারান্দার পাত্র এসব জায়গায় এডিস মশা জন্মাতে পারে। তাই এদিকে নজর রাখতে হবে।

একজন গর্ভবতী নারীর জ্বরকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারীর সামান্য জ্বরও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে আশার কথা হলো, ডেঙ্গু মানেই মৃত্যু নয়। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ মা ও শিশুকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। একটি মশার কামড় যেন কোনো পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্ন কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসা।

লেখক
ডা.ফাহমিদা রশীদ স্বাতি
সহকারী অধ্যাপক
প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram