

এইতো গত সপ্তাহের কথা। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সী এক নয় মাসের পোয়াতী। তার ছিল প্রথমে জ্বর, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা। ভেবেছিল সাধারণ ভাইরাল জ্বর। কিন্তু দুই দিন পর শুরু হয় প্রচণ্ড পেট ব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট এবং সাথে রক্তচাপ যায় কমে। ডাক্তার দেখে পরীক্ষা দিলে ধরা পড়ে ডেঙ্গু। হাসপাতালে যখন ভর্তি হয় তখন সাথে ছিল শ্বাসকষ্ট। চিকিৎসা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। একদিন পর আইসিইউতে ডেঙ্গুর কারণে রক্তের প্লাটিলেট কমে যায় দ্রুত। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মাকে আর আইসিইউ থেকে ফেরাতে পারেনি। ফিরেনি গর্ভের শিশুটিও।
এটি শুধু একটি মায়ের মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। বাংলাদেশে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ আবার বাড়ছে, তখন গর্ভবতী নারীরা বর্তমানে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।একটুখানি অবহেলা কেড়ে নিতে পারে মায়ের জীবন।তাই ডেঙ্গু নিয়ে সবাইকে জানতে হবে ও সতর্ক থাকতে হবে।
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
গর্ভাবস্থা নিজেই একটি বিশেষ শরীরবৃত্তীয় অবস্থা। এই সময়ে মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রক্তের পরিমাণ, হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। ফলে এই সময়ে ডেঙ্গু হলে জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর অনেক সময় সাধারণ জ্বরের মতো শুরু হলেও কয়েকদিন পর এটি গুরুতর রূপ নিতে পারে। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে-
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যা। কিন্তু বর্তমানে এটা মহামারীতে পরিনত হয়েছে।
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গুর লক্ষণ কী কী?
গর্ভবতী নারীদের ডেঙ্গুর লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ গর্ভকালীন অসুস্থতার সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১. হঠাৎ উচ্চ জ্বর
ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কী পরীক্ষা করতে হবে?
গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত ডেঙ্গু হলে বেশ কিছু পরীক্ষা করা হয়। সেগুলো হলো:
১. CBC (Complete Blood Count)
এতে দেখা হয়
গর্ভবতী নারীর ডেঙ্গুর চিকিৎসা কী?
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে -সে সামান্য জ্বরই হোক না কেন। মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু মানেই হাসপাতালে ভর্তি।
চিকিৎসা বলতে আসলে, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো-
ডেঙ্গুর কারণে মায়ের কী ঝুঁকি হতে পারে?
গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য জটিলতা-
১. রক্তক্ষরণ
*ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার কারণে প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। কখনো কখনো রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
২. ডেঙ্গু শক সিনড্রোম
*এটি সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতাগুলোর একটি। এতে রক্তচাপ অনেক কমে যায়। শরীরের অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত পায় না। তখন জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
৩. অকাল প্রসবের ঝুঁকি
*গুরুতর ডেঙ্গু হলে সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
শিশুর ওপর ডেঙ্গুর প্রভাব কী হতে পারে?
মায়ের ডেঙ্গু মানেই শিশুর ক্ষতি হবে এমন নয়। অনেক মা ডেঙ্গু থেকে সুস্থ হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তান জন্ম দেন। তবে অনেক সময় শিশুর গুরুতর সংক্রমণে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সম্ভাব্য শিশুর ঝুঁকিগুলো হলো-
ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় ডেলিভারি বা সিজারের ঝুঁকি কতটুকু?
ডেঙ্গু আক্রান্ত মায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেলিভারিতর সঠিক সময় নির্বাচন এবং মায়ের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন। তাহলে ঝুঁকি কখন বেশী? স্বাভাবিক প্রসবে নাকি সিজারে?
স্বাভাবিক প্রসব:
যদি মায়ের অবস্থা স্থিতিশীল থাকে, প্লাটিলেট গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকে, রক্তক্ষরণের ঝুঁকি না থাকে,
তাহলে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হতে পারে।
সিজারিয়ান সেকশন (C-section)
ডেঙ্গুর সক্রিয় পর্যায়ে সিজার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে কারণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া প্লাটিলেট কম থাকলে অপারেশনের জটিলতা বাড়ে।
সাথে অ্যানেস্থেশিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে অনেক বেশী।
তবে যদি শিশুর বা মায়ের জীবন বাঁচাতে জরুরি প্রয়োজন হয়, তখন চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে সিজার করতে পারেন।
মনে রাখতে হবে সিজার বা নরমাল উভয় ক্ষেত্রে রক্তে প্ল্যাটিলেট এর পরিমান থাকতে হবে নির্দিষ্ট পরিমান। তাই ডেঙ্গু রোগীর রক্তের প্রয়োজনীয়তার কথা পরিবারকে মনে রাখতে হবে।
গর্ভবতী নারীরা কীভাবে ডেঙ্গু থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন?
ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সুরক্ষা যেমন- দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার করা, ফুলহাতা পোশাক পরা, মশা নিরোধক ব্যবহার করা, জানালায় নেট ব্যবহার করা অতীব জরুরি এই সময়ে। খেয়াল রাখতে হবে বাড়ির আশপাশ যেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। ফুলের টব, জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা, পুরনো টায়ার, ছাদ বা বারান্দার পাত্র এসব জায়গায় এডিস মশা জন্মাতে পারে। তাই এদিকে নজর রাখতে হবে।
একজন গর্ভবতী নারীর জ্বরকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারীর সামান্য জ্বরও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে আশার কথা হলো, ডেঙ্গু মানেই মৃত্যু নয়। সময়মতো পরীক্ষা, সঠিক পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ মা ও শিশুকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। একটি মশার কামড় যেন কোনো পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বপ্ন কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজন সচেতনতা, সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসা।
লেখক
ডা.ফাহমিদা রশীদ স্বাতি
সহকারী অধ্যাপক
প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
