

একটি বিভাগের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার গ্রাজুয়েটদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রভাবের ওপর। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার হার যেখানে মাপকাঠি, সেখানে ‘শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান’ বিভাগটি গত এক দশকে বাংলাদেশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার স্বপ্ন থাকলেও, দেশের প্রথম সারির এই বিভাগগুলো এখনো ধুঁকছে মৌলিক অবকাঠামো আর মাঠ সংকটে।
বৈশ্বিক বাস্তবতা বনাম বাংলাদেশ
বর্তমানে উন্নত বিশ্বে স্পোর্টস সায়েন্স কেবল মাঠের দৌড়ঝাঁপ নয়, বরং কয়েকশ বিশেষায়িত শাখার এক বিশাল গবেষণার ক্ষেত্র। আমেরিকা ও চীন আজ বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে যে আধিপত্য দেখাচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী একাডেমিক ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৭টি প্রতিষ্ঠানে স্পোর্টস সায়েন্স এবং ৬৭টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে স্পোর্টস স্টাডিজের বিশেষ কোর্স চালু আছে। চীনে রয়েছে ১৬টি স্বতন্ত্র স্পোর্টস বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপের স্কুল পর্যায়ের স্পোর্টস ফ্যাসিলিটিজ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২০১১-১২ সেশনে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) প্রথম চার বছর মেয়াদী একাডেমিক কোর্স চালু করে। যবিপ্রবির মডেলটি অনন্য—এখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কৃতি অ্যাথলেট এবং মেধাবী সাধারণ শিক্ষার্থীরা একই বেঞ্চে বসে জ্ঞান অর্জন করেন। এই মিথস্ক্রিয়াটি পেশাদার খেলোয়াড়দের একাডেমিক বুনিয়াদ যেমন শক্ত করছে, তেমনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঠের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
যবিপ্রবি: সাফল্যের কারিগর ও বর্তমান দুর্দশা
যবিপ্রবির শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশসেরা পরিচিতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবথেকে বড় ইনডোর স্টেডিয়াম ও জিমনেসিয়ামের দাবি প্রশাসন আদায় করতে পেরেছে মূলত এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের আকাশচুম্বী অর্জনের কারণেই। কিন্তু পর্দার আড়ালে চিত্রটি বেশ করুণ।
১. তীব্র মাঠ সংকট: যেখানে ভারতের মতো দেশেও স্পোর্টস সায়েন্সের জন্য আলাদা আলাদা মাঠ বরাদ্দ থাকে, সেখানে যবিপ্রবিতে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় মাঠ ব্যবহার করতে হয়। একই মাঠে দুটি ছাত্র হল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের কার্যক্রম চলে। একটি ব্যাচে যখন ১৫ জন জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেট থাকে, তখন ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, হ্যান্ডবল, আর্চারি কিংবা অ্যাথলেটিক্সের মতো ডজনখানেক ইভেন্টের খেলোয়াড়রা একসাথে অনুশীলনের সুযোগ পান না। এই সুযোগের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় মাঝপথে খেলা ছেড়ে দিচ্ছেন।
২. ল্যাব সংকট: উন্নত দেশে স্পোর্টস সায়েন্স মানেই বায়োমেকানিক্স, নিউরোসায়েন্স, স্পোর্টস মেডিসিন এবং নিউট্রিশন ল্যাবের সমাহার। অথচ বাংলাদেশের প্রথম সারির এই বিভাগে ল্যাব সংকট। সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন ও পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেমের অভাবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখানে সীমিত হয়ে পড়ছে।
পেশাদারিত্বের অভাব ও শর্টকাট সংস্কৃতি
দেশে বর্তমানে ৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ চালু রয়েছে। এছাড়া ৬টি সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে ১ বছর মেয়াদী প্রফেশনাল কোর্স (BPEd) চালু রয়েছে। অসংখ্য ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট (বিপিএড) ও জুনিয়র ডিপ্লোমা ইন ফিজিক্যাল এডুকেশন এন্ড স্পোর্টস সাইন্স, যেখানে ক্লাস না করেও সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, এমন একটা সাবজেক্ট যেটা প্রাকটিকাল ও থিউরি দুই বিভাগ ই সামন গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনকভাবে, অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টিকে ভালোবেসে নয় বরং অন্য সাবজেক্টে জব না পেয়ে ‘শর্টকাট’ হিসেবে এই কোর্সটিকে বেছে নিচ্ছে। এতে প্রকৃত স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট বা বিশেষজ্ঞ তৈরির পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সময়ের দাবি: স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি ও রুট লেভেল পরিকল্পনা
বাংলাদেশের স্পোর্টস সেক্টরকে যদি আমরা বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে চাই, তবে কেবল স্বপ্ন দেখলে চলবে না। নিচের পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি:
স্বতন্ত্র স্পোর্টস বিশ্ববিদ্যালয়: গবেষণার পরিধি বাড়াতে দেশে অন্তত একটি বিশেষায়িত স্পোর্টস বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
মাঠ ও ল্যাব নিশ্চিতকরণ: যবিপ্রবিসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস সায়েন্সের জন্য পৃথক মাঠ ও আন্তর্জাতিক মানের অন্তত ৭-৮টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা: গ্রামীণ ও রুট লেভেলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কিছু নির্দিষ্ট কলেজে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানে স্নাতক(চার বছর মেয়াদি) বিভাগ চালু করতে হবে, যাতে তারা পচ্ছন্দের বিষয়ে পড়ে স্কুল-কলেজে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সোনালী দিন তখনই আসবে, যখন একজন অভিভাবক গর্ব করে তার সন্তানকে স্পোর্টস সায়েন্সে পড়ানোর স্বপ্ন দেখবেন। একাডেমিক চর্চা আর মাঠের সুযোগ-সুবিধা যদি সমান্তরালে চলে, তবেই বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা আরও উঁচুতে উড়বে। যবিপ্রবি, রাবি বা চবির শিক্ষার্থীরা যে লড়াই করছেন, তাকে সার্থক করতে এখন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা সময়ের দাবি।
লেখক
আল আমিন মুক্ত
শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর)
শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

