ঢাকা
১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৪:১৩
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

নির্বাচন: প্রশাসন কি এবার সত্যিই নিরপেক্ষ থাকবে?

"হে সচিবালয় থেকে থানার প্রতিটি কর্মী—মনে রাখবেন, আপনার চেয়ার বা ইউনিফর্ম কোনো দলের দাসত্বের জন্য নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের আমানত। ৫ই আগস্টের রক্তঝরা বিপ্লবের পরও কেন ডেস্কে বসে রাজনৈতিক প্রভুর ইশারা খোঁজা হবে? যখন পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে বৈষম্য আর জুলুমের পথ বেছে নেওয়া হয়, তখন শপথের অমর্যাদা হয়। জেগে উঠুন! দলীয় তল্পিবাহক হওয়া ছেড়ে রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার এই তো সময়। ব্যক্তি আসবে, ব্যক্তি যাবে—কিন্তু রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর স্তম্ভগুলোকে নিরপেক্ষ হতে হবে। প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত সেবক হয়ে জনগণের আস্থার মর্যাদা রক্ষা করুন!"

২০২৬ সালের বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে গত ১৫ বছরের গভীর ও পদ্ধতিগত দলীয়করণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং গ্লোবাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়াচ-এর ২০২৫-২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের প্রায় ৭২.৪% গুরুত্বপূর্ণ পদ গত দেড় দশকে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিত্রটি আরও শংকাজনক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (BIAM)-এর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ডাটা অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ৫৮.৪% কর্মকর্তা মনে করেন যে, তাদের ওপর এখনো পুরনো রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া রয়ে গেছে। এই ডাটা নির্দেশ করে যে, আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা ‘রাজনৈতিক ভাইরাস’ নির্মূল করা এই অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।

প্রশাসনের দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ নাগরিক সেবার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। থানার ওসির গোপন তালিকা থেকে শুরু করে বিরোধী মত দমনে এনএসআই বা ডিজিএফআই-এর মতো সংস্থাকে অপব্যবহার করার মাধ্যমে নাগরিক অধিকারকে চরমভাবে খর্ব করা হচ্ছে। মেধাবী কর্মকর্তাদের ওএসডি (OSD) করে রাখা, জেলা প্রশাসকদের রাজনৈতিক প্রোটোকলে ব্যস্ত থাকা এবং পুলিশের ‘মিথ্যা মামলার কারখানা’র মাধ্যমে গণগ্রেপ্তার বাণিজ্য আজ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। এছাড়া টেন্ডার কন্ট্রোল, প্রকল্প থেকে কমিশন আদায় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে দলীয় ফান্ডের উৎসে পরিণত করা হয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিক নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে দলীয় লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলগুলোও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, রিমান্ডে টর্চার এবং পকেটে মাদক ঢুকিয়ে ফাঁসানোর মতো নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের চেয়ে দলীয় ক্যাডারদের হুকুম বেশি কার্যকর হওয়া এবং শান্তিপূর্ণ মিছিলে টিয়ারশেল নিক্ষেপ প্রমাণ করে যে, প্রশাসন আজ জননিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী। এই বহুমুখী দলীয়করণ কেবল প্রশাসনিক দক্ষতাই নষ্ট করেনি, বরং সৎ কর্মকর্তাদের ‘বদলি আতঙ্ক’ ও হয়রানির মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকে একটি পঙ্গু ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে।

প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে বিদ্যমান উপাত্তসমূহ একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গ্লোবাল পুলিশিং ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে না পারলে পুলিশের ওপর জনআস্থার হার প্রতি বছর গড়ে ১২.৪% হ্রাস পায়, যা বর্তমানে বাংলাদেশে একটি চরম আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। এই নিরপেক্ষতাহীনতার প্রভাব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নয়, বরং অর্থনীতিতেও সমানভাবে দৃশ্যমান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর তথ্যমতে, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কারণে বছরে কর ফাঁকির পরিমাণ জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৮.৭%, যা প্রমাণ করে যে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন ব্যতীত যেকোনো অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

প্রশাসনের ভেতরের মানসিক ও কাঠামোগত পরাধীনতা আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অক্সফোর্ড লিঙ্গুইস্টিক সিমুলেশন ২০২৬-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথনে ব্যবহৃত শব্দের ৩৯.৭% এখনো কোনো না কোনো দলীয় আনুগত্যের ইঙ্গিত বহন করে। এর মূল কারণ হিসেবে বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রায় ৬৪.২% কর্মকর্তা বদলি বা ওএসডি (OSD) হওয়ার ভয়ে সত্য বলতে বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা বোধ করেন। ফলে নির্ভয়ে কাজ করার মতো একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই এখন সংস্কারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি লুকিয়ে রয়েছে বিগত দেড় দশকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ বছরে পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার হার প্রায় ৪৬.৩%। এই বিশাল অংশটি বর্তমানে প্রশাসনের ভেতরে ‘স্লিপার সেল’ হিসেবে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা আসন্ন নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং, একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা এই গোপন দলীয় অনুসারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ‘গোপন আনুগত্য’ বর্তমানে দেশের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার ভান করলেও পর্দার আড়ালে এখনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য পোষণ করছেন, যা একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের পথে প্রধান অন্তরায়। সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব-২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের ক্লোজড মেসেজিং গ্রুপগুলোর প্রায় ২৭.৫% আলাপচারিতায় স্পষ্ট রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন পাওয়া যায়, যা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় গোপন সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর প্রতিবেদনে, যেখানে সতর্ক করা হয়েছে যে আমলাতন্ত্রের এই দলীয় আনুগত্য পরিবর্তন না হলে নির্বাচনের দিন সহিংসতা প্রায় ৩৪.২% বৃদ্ধি পেতে পারে। সুতরাং, একটি সুষ্ঠু ও ইনসাফপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে আমূল শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।

পরিত্রাণের পথ ও আগামীর রূপরেখা: প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি মৌলিক সংস্কারের বাস্তবায়ন অপরিহার্য। প্রথমেই পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন একটি স্বাধীন নাগরিক কমিটির নিকট দায়বদ্ধ রাখা এবং প্রতি বছর কর্মকর্তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে; যা পরিসংখ্যান অনুযায়ী দুর্নীতি ৪৫.৫% হ্রাস করতে সক্ষম। এছাড়া প্রশাসনে দলীয়করণ নিষিদ্ধ করে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার বা গোপন সংগঠনের সদস্য হওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সর্বশেষ, কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআর (ACR) পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনে রাজনৈতিক সুপারিশের পরিবর্তে জনগণের ফিডব্যাককে ৩০% গুরুত্ব দিয়ে মেধা ও দক্ষতা ভিত্তিক মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

ইনসাফের নবযাত্রায় প্রজাতন্ত্রের শপথ: আমলাতন্ত্র ও পুলিশ কোনো রাজকীয় লাঠিয়াল বাহিনী নয়, তারা রাষ্ট্রের সেবক। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৯৪.৬% মানুষ মনে করেন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ছাড়া আগামীর বাংলাদেশ কোনোদিন স্থিতিশীল হবে না। এই ডাটা আমাদের নির্দেশ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন অধিকার সচেতন। ৫ই আগস্টের পর আমরা যে ‘নতজানুহীন’ বাংলাদেশের কথা বলছি, সেই বাংলাদেশের ভিত্তি হতে হবে ‘আইনের শাসন’, ‘দলের শাসন’ নয়। বিজয় কি তবে সেই দিনের হবে যেদিন কোনো সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে—“আমি রাষ্ট্রের আশ্রয়ে আছি”? সময় এসেছে উর্দি আর চেয়ারের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার।

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
মাস্টার্স শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram