ঢাকা
২২শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১০:৩৮
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০২৬

জ্ঞানের চাকা: ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও সমাজ রূপান্তরের হাতিয়ার

একটি সমাজের মেরুদণ্ড যদি শিক্ষা হয়, তবে লাইব্রেরি হলো সেই মেরুদণ্ডের প্রাণশক্তি। কিন্তু ব্যস্ততম নাগরিক জীবন, তীব্র যানজট কিংবা গ্রাম ও শহরের সুযোগের বিস্তর ব্যবধানের কারণে লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ার সুযোগ বা সময় অনেকেরই হয়ে ওঠে না। ঠিক এই শূন্যস্থানটি পূরণ করতেই আবির্ভূত হয়েছে ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’। এটি কেবল বইভর্তি একটি যান্ত্রিক যান নয়, বরং এটি একটি চলমান আলোকবর্তিকা, যা জ্ঞানকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। ‘মানুষ বইয়ের কাছে যাবে’—এই চিরাচরিত ধারণা ভেঙে ‘বই মানুষের কাছে আসবে’—এই দর্শনটিই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মূল ভিত্তি।

সমাজের সর্বস্তরে জ্ঞানের গণতন্ত্রায়নে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ভূমিকা অনস্বীকার্য। শহরের বড় লাইব্রেরিগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে মফস্বল বা গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি এই ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধা দূর করে। এটি গ্রামের মেঠো পথ কিংবা শহরের অলিগলি পেরিয়ে পৌঁছে যায় এমন সব পাঠকের কাছে, যারা হয়তো কখনোই লাইব্রেরির চৌকাঠ মাড়াতেন না। এর ফলে গৃহিণী, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা ঘরের বাইরে যেতে পারেন না, তারাও বিশ্বসাহিত্যের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পান। এটি মূলত শিক্ষার অধিকারকে একটি বিলাসিতা থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকারে রূপান্তর করে।

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী তা কিছু পরিসংখ্যান ও তথ্যের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তথ্যানুযায়ী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্প বর্তমানে দেশের প্রায় অধিকাংশ জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের বহরে থাকা শতাধিক ভ্রাম্যমাণ গাড়ি প্রায় ৩ লক্ষাধিক নিয়মিত পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অফ লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন (IFLA)-এর মতে, বিশ্বজুড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার হার বাড়াতে এবং 'রিডিং গ্যাপ' কমাতে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি সাধারণ লাইব্রেরির চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি শৌখিন উদ্যোগ নয়, বরং সাক্ষরতা ও জ্ঞানবিকাশে এর অবদান গাণিতিকভাবেও প্রমাণিত।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের ওপর ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। এই প্রজন্মটি জন্মগতভাবেই ডিজিটাল জগতের বাসিন্দা, যাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা 'Attention Span' ক্রমশ কমে আসছে। টিকটক আর রিলসের ১৫ সেকেন্ডের বিনোদনের ভিড়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ার অভ্যাস তাদের প্রায় নেই বললেই চলে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি এই ডিজিটাল আসক্তি ভাঙার একটি শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করছে। যখন তাদের হাতের নাগালে হ্যারি পটার, সায়েন্স ফিকশন কিংবা গ্রাফিক নভেল পৌঁছে যায়, তখন তারা স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে পাতার ঘ্রাণ নিতে আগ্রহী হয়। এছাড়া আধুনিক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিগুলো এখন 'হাইব্রিড মডেল' অনুসরণ করছে—যেখানে বইয়ের পাশাপাশি অডিও বুক এবং ই-রিডিংয়ের সুবিধাও থাকছে, যা প্রযুক্তিপ্রেমী জেন-জিকে সহজেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম। এটি তাদের তথ্যের ভোক্তা থেকে চিন্তাশীল নাগরিকে পরিণত করতে সহায়তা করছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ধারণাটি কেবল বই লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি একটি 'চলমান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র' বা 'Community Hub'-এ রূপান্তরিত হবে। ভবিষ্যতে আমরা হয়তো দেখব পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেইক্যাল বা সোলার প্যানেল চালিত স্মার্ট লাইব্রেরি বাস, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে ওয়াইফাই হটস্পট হিসেবেও কাজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে পাঠকের পছন্দ অনুযায়ী বই সাজেস্ট করা বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ব্যবহার করে ইতিহাসের বই পড়ার সময় সেই যুগে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দেওয়া—এমন সব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি যুক্ত হতে পারে। এই বিবর্তন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিকে কেবল টিকে থাকতেই সাহায্য করবে না, বরং আগামী দিনের স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট ভিলেজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করবে।

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লাইব্রেরি নিয়ে যে ‘মহাসমুদ্রের’ উপমা দিয়েছিলেন, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি সেই সমুদ্রের জলরাশিকে ছোট ছোট কলসে ভরে তৃষ্ণার্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। একটি আলোকিত, কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল সমাজ গড়তে এই উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। বই যখন পাঠকের কাছে যায়, তখন কেবল জ্ঞানই যায় না, যায় স্বপ্ন দেখার সাহসও। তাই সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই ‘জ্ঞানের ফেরিওয়ালা’দের চাকা সচল রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
মাস্টার্স শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1736 786915, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram